ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

টেক্সাসে রাজনৈতিক ভূমিকম্প: ট্রাম্পের দুর্গে ডেমোক্র্যাটদের অভাবনীয় জয়

টেক্সাসে রাজনৈতিক ভূমিকম্প: ট্রাম্পের দুর্গে ডেমোক্র্যাটদের অভাবনীয় জয়

যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর রক্ষণশীল স্টেট হিসেবে পরিচিত টেক্সাসের রাজনৈতিক সমীকরণে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। গত শনিবার অনুষ্ঠিত স্টেট লেজিসলেটিভ স্পেশাল ইলেকশনে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টেইলর রেহমেট এক বিশাল জয় পেয়েছেন। যে ডিস্ট্রিক্টে মাত্র এক বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৭ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ২০২৬-এর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান শিবিরে বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অভাবনীয় ব্যবধানে জয়

স্থানীয় ইউনিয়ন নেতা এবং প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নেওয়া ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টেইলর রেহমেট (৩৩), অভিজ্ঞ রিপাবলিকান প্রার্থী লি ওয়াম্বসগানসকে ৫৭-৪৩ শতাংশ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। উল্লেখ্য, এই আসনটি দীর্ঘকাল ধরে রক্ষণশীলদের দখলে ছিল। নভেম্বরের প্রথম দফার ভোটে রেহমেট অভাবনীয় ফলাফল করার পর থেকেই ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (DNC) সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় গোষ্ঠী এই আসনে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে।

ট্রাম্প ও অ্যাবটের প্রচেষ্টা ব্যর্থ

রিপাবলিকানদের জন্য এই পরাজয় অত্যন্ত গ্লানিকর, কারণ লি ওয়াম্বসগানসের পক্ষে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন। এছাড়া টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং লেফট্যানেন্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিকও তার হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। রিপাবলিকান নেতাদের আশঙ্কা ছিল, এই আসনে হারলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে টেক্সাস স্টেটে ডেমোক্র্যাটদের অর্থায়ন ও প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে—যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিলো।

ফোর্ট ওয়ার্থ ও হিউস্টনের নির্বাচনী চিত্র

একই দিনে টেক্সাসে দুটি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ফোর্ট ওয়ার্থে যখন ডেমোক্র্যাটদের জয়জয়কার, তখন হিউস্টনের ১৮তম কনগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ব্ল্যাক ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এক তীব্র লড়াই শেষে জয়ী হয়েছেন ক্রিশ্চিয়ান মেনেফি (৩৭)। তিনি সাবেক হিউস্টন সিটি কাউন্সিল সদস্য আমান্ডা এডওয়ার্ডসকে পরাজিত করেছেন। এই আসনটি ঐতিহাসিকভাবে বারবারা জর্ডান এবং শিলা জ্যাকসন লির মতো প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের দখলে ছিল।

টেক্সাস কি নীল (Blue) হওয়ার পথে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টেক্সাসের এই বিশেষ নির্বাচনের ফলাফল কেবল একটি আসনের জয়-পরাজয় নয়, বরং এটি আমেরিকান রাজনীতির গভীরতর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর প্রধান দিকগুলো হলো:

১. মধ্যপন্থীদের প্রত্যাবর্তন ও কট্টরপন্থা বর্জন:

রিপাবলিকান প্রার্থী লি ওয়াম্বসগানস ২০২২ সালে স্কুল বোর্ডগুলোতে কট্টর সামাজিক রক্ষণশীল এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু গত বছর থেকেই সাধারণ ভোটাররা এই উগ্রপন্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। মডারেট বা মধ্যপন্থী ভোটারদের এই পরিবর্তনই রেহমেটের জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।

২. শ্রমিক শ্রেণির সমর্থন ও ‘লেবেল’ বর্জন:

টেইলর রেহমেট একজন পেশাদার মেশিনিস্ট। তিনি নিজেকে কোনো দলীয় লেবেলে আবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের ‘পাবলিক এডুকেশন’ এবং ‘ভোকেশনাল প্রোগ্রাম’-কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ফোর্ট ওয়ার্থের মতো শিল্পাঞ্চলে তার এই ‘সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ’ ইমেজ ভোটারদের মন জয় করেছে।

৩. ভোটার টার্নআউট ও ডেমোগ্রাফিক শিফট:

টেক্সাসের শহরতলি এলাকাগুলোতে (Suburbs) জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটছে। তরুণ ভোটার এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ায় ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান ভোট ব্যাংক সংকুচিত হচ্ছে। শনিবারে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জয় নিশ্চিত করেছে।

৪. নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং ও জনরোষ:

হিউস্টনের ১৮তম আসনে গভর্নর অ্যাবট দীর্ঘকাল নির্বাচন পিছিয়ে রেখেছিলেন যাতে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকে। ভোটারদের মধ্যে এই ‘গণতান্ত্রিক বঞ্চনা’র ক্ষোভ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি করেছে।

একনজরে নির্বাচনের পরিসংখ্যান

ফোর্ট ওয়ার্থ স্পেশাল ইলেকশনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেখানে রিপাবলিকানরা অর্থাৎ ট্রাম্প ১৭ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন, ২০২৬-এর এই বিশেষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টেইলর রেহমেট ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, বিপরীতে রিপাবলিকান প্রার্থী লি ওয়াম্বসগানস পেয়েছেন ৪৩ শতাংশ ভোট। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর প্রধান ইস্যু ছিল জনশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কট্টরপন্থা বর্জন।

সামনে বড় লড়াই

টেইলর রেহমেট আপাতত চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত মেয়াদে থাকবেন। তবে আগামী নভেম্বরেই আবার এই আসনে পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে হিউস্টনের বিজয়ী ক্রিশ্চিয়ান মেনেফিকে শপথ নেওয়ার আগেই আগামী ৩ মার্চের প্রাইমারি নির্বাচনের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করতে হবে, যেখানে তিনি বর্ষীয়ান নেতা আল গ্রিনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন।

টেক্সাসের এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, কোনো আসনই এখন আর ‘নিরাপদ’ নয়। ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিন ঠিকই বলেছেন, “ট্রাম্প ১৭ প্লাস ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকানরা সব শক্তি দিয়েও হার ঠেকানো পারেনি।” ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাস স্টেট হতে যাচ্ছে আমেরিকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রণক্ষেত্র।