বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ এবং ইসলামপন্থার উত্থান নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড ফাঁসের দাবি করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। ওই অডিওতে ঢাকাভিত্তিক এক মার্কিন কূটনীতিককে বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত কিছু মন্তব্য করতে শোনা গেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ওই কূটনীতিকের মতে বাংলাদেশ বর্তমানে ইসলামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে। এমন এক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী বলে অডিওতে আভাস পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক উপস্থিত নারী সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান যে, তারা জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের নেতাদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাবেন কি না। এই প্রশ্নটি বাংলাদেশে জামায়াত ও শিবিরের সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে মার্কিন আগ্রহের একটি বিশেষ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জামায়াত ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শরীয়াহ আইন চালু করবে কি না, তা নিয়ে কূটনীতিকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে অডিওতে। ওই কর্মকর্তা মনে করেন, জামায়াত সম্ভবত কঠোর শরীয়াহ আইন প্রবর্তন করবে না।
তবে শরীয়াহ আইনের প্রয়োগ এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ওই কূটনীতিক কড়া হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শরীয়াহ আইন কার্যকর করা হয় এবং নারীদের কর্মঘণ্টা সীমিত করে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র আর বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের কোনো ক্রয়াদেশ বা অর্ডার নেবে না। ওই কূটনীতিকের ভাষায়, অর্ডার না থাকার অর্থ হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একটি বড় অংশকে শরীয়াহ আইনের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে ওই আলোচনায়। এমনকি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ওয়াশিংটন পোস্ট এই অডিওর সত্যতা এবং বৈঠকের বিষয়ে জানতে ঢাকাভিত্তিক মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মোনিকা শিই-র সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। মোনিকা জানান, গত ডিসেম্বরে এই আলোচনাটি নিয়মিত বৈঠকের অংশ হিসেবেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে মার্কিন কর্মকর্তারা স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এ ধরণের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের আলাপচারিতা সাধারণত জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য নয়। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না। বাংলাদেশের জনগণের রায় বা ভোটের মাধ্যমে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গেই গঠনমূলক কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান ব্যক্তিগত বা কূটনৈতিক বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও জানিয়েছেন যে, গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে ওয়াশিংটনে জামায়াত প্রতিনিধি এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত চারবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এছাড়া ঢাকাতেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জামায়াত নেতাদের বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি জানান। অতি সম্প্রতি গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিসন গ্রেয়ারের সঙ্গেও জামায়াতের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির এক নতুন চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই নমনীয় বা কৌশলগত অবস্থান অনেকের কাছেই বিস্ময়কর হতে পারে। তবে এর পেছনে সম্ভবত বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পালাবদল এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। পোশাক শিল্পের ওপর শুল্কারোপ বা অর্ডার বন্ধের হুঁশিয়ারিটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাসনের ওপর জোর দিচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে বারবার বৈঠক এবং আগামী নির্বাচনে তাদের ভালো করার পূর্বাভাস এটাই প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এখন থেকেই ভবিষ্যতের ক্ষমতার অংশীদারদের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরিতে মনোযোগী। তবে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে এই বিদেশি হস্তক্ষেপ বা পর্যবেক্ষণ সাধারণ ভোটারদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।