মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বর্তমান সময়টি এক অদ্ভুত ও অস্থির সন্ধিক্ষণ। হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পালন করা ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন, যা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপ বা পোলের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমর্থন বা 'নেট অ্যাপ্রুভাল রেটিং' এখন তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তার হ্রাস নয়, বরং আসন্ন ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির টিকে থাকার লড়াইয়ে এক বড় ধরনের অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জরিপের বয়ান: জনপ্রিয়তার কোনো ‘ফ্লোর’ নেই ট্রাম্পের?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন স্বাধীন পোলিং এজেন্সির তথ্যমতে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পারদ এখন এতটাই নিচে যে বিশ্লেষকরা একে 'পাতালমুখী' বলে অভিহিত করছেন। সাধারণত প্রতিটি প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার একটি নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন স্তর বা ‘ফ্লোর’ থাকে, যার নিচে সমর্থন সাধারণত নামে না। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তিনি সেই ফ্লোর ভেঙে আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছেন।
একাধিক স্বনামধন্য পোলস্টারের তথ্য অনুযায়ী চিত্রটি নিম্নরূপ:
AP-NORC: এই জরিপে ট্রাম্প ২৬ পয়েন্ট পিছিয়ে আছেন।
NBC News: এখানে তিনি ২২ পয়েন্ট ‘আন্ডারওয়াটার’ বা নেতিবাচক অবস্থানে।
Yahoo News/YouGov: এখানে তিনি ২০ পয়েন্ট পিছিয়ে।
Quinnipiac University: এখানে তিনি ১৯ থেকে ২৬ পয়েন্ট পর্যন্ত নেতিবাচক রেটিং পাচ্ছেন।
গড়ে ট্রাম্প এখন ২২ পয়েন্ট নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন। যদি আমরা তাঁর প্রথম মেয়াদের (First Term) সাথে তুলনা করি, তবে দেখা যায় প্রথম মেয়াদে এই সময়ে তিনি ১৭ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ, নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙে তিনি ৫ পয়েন্ট বেশি নেতিবাচক অবস্থানে পৌঁছেছেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, জো বাইডেন তাঁর মেয়াদের এই সময়ে ১৩ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিলেন, যেখানে ট্রাম্প পিছিয়ে আছেন তার দ্বিগুণ। রাজনৈতিক ময়দানে এটি ট্রাম্পের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর তুলনা, কারণ তিনি সবসময় নিজেকে বাইডেনের চেয়ে সফল দাবি করে আসছেন।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভোটারদের বিমুখতা: হোয়াইট হাউসের জন্য বড় হুমকি
আমেরিকার নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ বা নির্দলীয় ভোটারদের রায়ে। ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান—উভয় দলেরই নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক থাকে, কিন্তু মাঝখানের এই দোদুল্যমান ভোটাররা যার দিকে ঝোঁকেন, দিনশেষে তিনিই জয়ী হন। ট্রাম্পের জন্য বর্তমান উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো এই ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভোটারদের মনোভাব।
প্রথম মেয়াদে এই সময়ে নির্দলীয় ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের রেটিং ছিল -১৭ পয়েন্ট। কিন্তু কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে -২৭ পয়েন্টে। অর্থাৎ, গত কয়েক বছরে তিনি ১০ শতাংশ নির্দলীয় ভোটারের সমর্থন হারিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো প্রেসিডেন্ট ভোটারদের এই মধ্যমপন্থী অংশটিকে হারান, তখন কেবল তিনি নিজে নন, তাঁর পুরো দল এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। আমেরিকার ইতিহাসে দেখা গেছে, মিডটার্ম নির্বাচনে এই ধরনের রেটিং থাকলে ক্ষমতাসীন দল সংসদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। জো বাইডেনের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল, এবং ট্রাম্পের বর্তমান দশা বাইডেনের চেয়েও খারাপ হওয়াতে রিপাবলিকানদের মধ্যে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রিপাবলিকান শিবিরের ফাটল: নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বে টান?
গত ১৩ মাস ধরে রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ছিল লৌহকঠিন। দলের ভেতরে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস খুব কম নেতারই ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। জনপ্রিয়তার ধস নামার সাথে সাথে দলের অনেক নেতা এখন ‘সেলফ-প্রিজারভেশন’ বা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার চিন্তায় বিভোর।
ওয়াশিংটনের অলিন্দে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, অনেক রিপাবলিকান সংসদ সদস্য এখন ট্রাম্পের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল খুঁজছেন। বিশেষ করে যাঁরা আসন্ন নির্বাচনে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন (Frontline Lawmakers), তাঁরা দেখছেন যে ট্রাম্পের বিতর্কিত ইমেজ তাঁদের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকটি ঘটনায় এই দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে:
১. ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের ব্যর্থতা: ট্রাম্পের প্রচ্ছন্ন ইশারায় ডেমোক্র্যাটদের ৬ জন হাউস মেম্বারকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। অনেক রিপাবলিকান নেতা এই প্রচেষ্টাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করে ব্যক্তিগতভাবে অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
২. আইস (ICE) অভিযান: মিনিয়াপলিসসহ বিভিন্ন শহরে ট্রাম্পের নির্দেশে অভিবাসনবিরোধী অভিযান বা 'আইস সার্চ' অনেক মধ্যপন্থী রিপাবলিকানকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
৩. বিতর্কিত ভিডিও: সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামাকে নিয়ে ট্রাম্পের শেয়ার করা একটি বিতর্কিত ভিডিও শেষ পর্যন্ত মুছে ফেলতে বাধ্য হওয়া তাঁর দলের ইমেজে আঘাত হেনেছে।
যদিও ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থকরা দাবি করছেন দলের ভেতর কোনো ফাটল নেই, কিন্তু বিশ্লেষকরা একে ‘ধীরগতির ভাঙ্গন’ হিসেবে দেখছেন। অনেক নেতা এখন ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টের পাল্টা প্রতিক্রিয়াকে আর ভয় পাচ্ছেন না।
ভোটদান পদ্ধতি ও সাংবিধানিক বিতর্ক: ট্রাম্পের নতুন চাল
জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় ট্রাম্প এখন আবার পুরোনো কৌশলে ফিরছেন—নির্বাচনী ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, মিডটার্ম নির্বাচনের আগেই তিনি ‘ভোটার আইডি’ এবং ‘মেল-ইন ব্যালট’ বা ডাকযোগে ভোটদান নিষিদ্ধ করার জন্য নির্বাহী আদেশ (Executive Order) জারি করবেন।
ট্রাম্পের দাবি, কংগ্রেস যদি আইন পাস না করে, তবে তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করে এই পরিবর্তন আনবেন। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে এক বড় সাংবিধানিক বিতর্ক। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে স্টেটগুলোর, ফেডারেল সরকারের নয়। ট্রাম্পের এই ধরনের নির্বাহী আদেশ সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
মজার বিষয় হলো, অতীতে অনেক রিপাবলিকান শাসিত অঙ্গরাজ্যই ডাকযোগে ভোটদান পদ্ধতিকে উৎসাহিত করেছিল কারণ এর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলের ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়, যা রিপাবলিকানদের জন্য সুবিধাজনক। এখন ট্রাম্পের এই গোঁয়ার্তুমি দলের তৃণমূল পর্যায়ের কৌশলের সাথেও সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগামীর পথ: ২৬১ দিনের চ্যালেঞ্জ
মিডটার্ম নির্বাচনের আর মাত্র ২৬১ দিন বাকি। আমেরিকার রাজনীতিতে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প বর্তমানে নর্থ ক্যারোলিনা সহ বিভিন্ন দোদুল্যমান স্টেটে প্রচারণা শুরু করেছেন। সেখানে তিনি যথারীতি জো বাইডেনকে "আমেরিকার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট" হিসেবে আখ্যায়িত করছেন এবং কট্টর বামপন্থীদের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর ডাক দিচ্ছেন।
কিন্তু ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক কৌশল কি মধ্যপন্থী ভোটারদের মন গলাতে পারবে? জরিপের উপাত্ত বলছে—না। ট্রাম্পের মনোযোগ এখন মূলত তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংক ধরে রাখার দিকে, কিন্তু তাতে হয়তো ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা (যেমন মার্কো রুবিও) এখন থেকেই নিজেদের আলাদাভাবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। অনেকে দেশের বাইরে গিয়ে নিজেদের আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যা প্রকারান্তরে ট্রাম্পের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করারই নামান্তর।
বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ: ট্রাম্পের ট্র্যাজেডি না কি ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই?
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এক অদ্ভুত বৃত্তে বন্দি। তিনি যত বেশি উগ্র রক্ষণশীল বার্তা দিচ্ছেন, তাঁর কট্টর সমর্থকরা তত খুশি হচ্ছেন, কিন্তু ঠিক ততটাই দূরে সরে যাচ্ছেন সাধারণ নির্দলীয় ভোটাররা। আমেরিকার রাজনীতিতে ‘মাইনাস ৩০ পয়েন্ট’ জনপ্রিয়তার রেটিং নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা প্রায় অলৌকিক বিষয়।
রিপাবলিকানরা চাচ্ছেন ট্রাম্প যেন অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দেন, কিন্তু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মনোযোগ কেবল ইমিগ্রেশন, ভোটার আইডি এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দিকে। এই কৌশলগত ভুল রিপাবলিকানদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। বাইডেনের সময় অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে মানুষ অসন্তুষ্ট ছিল, কিন্তু ট্রাম্পের অতি-আগ্রাসী আচরণ মানুষকে আরও বেশি ভীত করে তুলছে।
পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকার আগামী মিডটার্ম নির্বাচন কেবল ট্রাম্পের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং তা নির্ধারিত করবে রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ গতিপথ। ট্রাম্প যদি তাঁর জনপ্রিয়তার এই ধস থামাতে না পারেন, তবে হোয়াইট হাউস দখল করেও তিনি এক ‘ল্যাম ডাক’ বা ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট হিসেবেই দিন গুনবেন। জনগণের রায় আর জরিপের সংখ্যার এই বৈপরীত্য আগামী মাসগুলোতে ওয়াশিংটনের রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।