রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বলরুম আজ এক জনাকীর্ণ রাজনৈতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার উপস্থাপন করেন, যা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচার ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা।
নিচে বিএনপির ঘোষিত সেই ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি এবং সেগুলোর আর্থ-সামাজিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হলো:
১. প্রান্তিক পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও আর্থিক সুরক্ষা: বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, ক্ষমতায় গেলে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সরাসরি নগদ প্রদান অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই পদক্ষেপটি মূলত দেশের ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল রাখার একটি প্রচেষ্টা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সরাসরি নগদ অর্থ প্রবাহ গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে এবং অতি-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। পর্যায়ক্রমে এই ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর ঘোষণাটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
২. কৃষক কার্ড ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় সহায়তা: কৃষিখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষিবিমা চালুর কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে কৃষি এখনও একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকরা প্রায়ই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বিএনপির ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সরাসরি বাজারজাতকরণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা সফল হলে ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমবে। মৎস্য ও পশুপালন খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এই সুবিধার আওতায় আনা সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করবে।
৩. স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ: স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দেশব্যাপী এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক (Preventive Health) কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজধানীর ওপর স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব হবে।
৪. দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি: ইশতেহারে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে ‘আনন্দময় ও কর্মমুখী’ করার কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রযুক্তিবান্ধব পরিবেশ এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে। বাস্তব দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে এমন এক প্রজন্ম তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যারা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে।
৫. তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম: দেশের বিশাল শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ বিনিয়োগ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে দেশের তরুণদের যুক্ত করার পরিকল্পনাটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার ঘোষণাটি আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি শক্ত বার্তা।
৬. পেশাদার ক্রীড়া কাঠামো ও প্রশিক্ষণ: খেলাধুলাকে কেবল বিনোদন হিসেবে না দেখে একটি সম্মানজনক পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা উঠে আসার সুযোগ পাবেন। এটি তরুণ সমাজকে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হবে।
৭. পরিবেশ রক্ষা ও নদী পুনখনন প্রকল্প: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ার এই পরিকল্পনাটি অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব। জনগণের ‘স্বেচ্ছাশ্রম’ ব্যবহারের ধারণাটি সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়ন কাজে গণসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করবে।
৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি ও উপাসনালয় ভিত্তিক কল্যাণ: সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। ধর্মীয় নেতাদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা সমাজ সংস্কার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও পেপাল চালু: তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দীর্ঘদিনের দাবি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ (PayPal) বাংলাদেশে চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এছাড়া ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক রূপরেখা এখানে ফুটে উঠেছে।
বিএনপির এই ইশতেহারে বারবার ‘অধিকার’ এবং ‘ন্যায়বিচার’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। দলটি স্পষ্টভাবে বলেছে যে, তারা ভয়ের বদলে অধিকার এবং লুটেরা অর্থনীতির বদলে উৎপাদনমুখী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত এমন এক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটের মর্যাদা সংরক্ষিত থাকবে। দলটির ভাষায়, এই ইশতেহার বাস্তবায়িত হলে ক্ষমতার দাপট নয়, বরং জনগণের ইচ্ছাই হবে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি।