বাংলাদেশের স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান তার উদ্ভাবিত সৌরচালিত ভাসমান স্কুল উদ্যোগের জন্য অর্জন করেছেন ইউনেসকোর মর্যাদাপূর্ণ কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫। শিক্ষায় উদ্ভাবন ও জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রসারে দেওয়া এই পুরস্কারটি বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, যা চীনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদান করা হয়।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রেজোয়ানের প্রতিষ্ঠান সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে শত শত মনোনয়নের মধ্যে থেকে ইউনেসকো তিনটি উদ্যোগকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সিধুলাই ভাসমান স্কুল, আয়ারল্যান্ডের লার্ন উইথ নালা ই-লার্নিং, এবং মরক্কোর সেকেন্ড চান্স স্কুল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ এডুকেশন প্রোগ্রাম।
২০তম পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় চীনের শানডং প্রদেশের চুফু শহরে, মহান দার্শনিক কনফুসিয়াসের জন্মস্থানে। সেখানে রেজোয়ান তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ট্রফি ও সনদ গ্রহণ করেন।
শৈশবে রেজোয়ান বেড়ে উঠেছেন চলনবিল এলাকায়, যেখানে প্রতিবছর বন্যায় স্কুল বন্ধ হয়ে যেত। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০০২ সালে তিনি উদ্ভাবন করেন এক অনন্য সমাধান—স্থানীয় নৌকাকে রূপান্তর করেন ভাসমান স্কুলে। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই প্রথম ভাসমান স্কুল, যা এখন শিক্ষার পাশাপাশি লাইব্রেরি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই সৌরচালিত স্কুলগুলো বর্ষাকালে পানিবেষ্টিত এলাকাগুলোকেও শিক্ষার আলোয় আলোকিত করছে।
ইউনেসকো এক বিবৃতিতে বলেছে, বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত উপায়ে সাক্ষরতা ও শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াই এই ভাসমান স্কুলের সাফল্যের মূল।
বর্তমানে সিধুলাইয়ের মডেল অনুসরণ করছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এনজিও, এবং এটি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশকে। এমনকি বাংলাদেশ সরকারও এই উদ্যোগকে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০৫০-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
পুরস্কার অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, শিক্ষা শুধু পড়া-লেখা নয়, এটি শান্তি, সমতা ও সহনশীলতা গড়ে তোলে। আমি বিশ্বাস করি, সাক্ষরতা ও জ্ঞানের শক্তি আমাদের এমন ভবিষ্যৎ তৈরি করবে, যেখানে কোনো দুর্যোগই কোনো শিশুর শিক্ষাকে থামাতে পারবে না।
এদিকে, ফ্রান্সের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইমিগ্রেশন হিস্ট্রিতে বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে ‘বোট স্কুলস অব বাংলাদেশ—ফিউচার দ্যাট ফ্লোটস’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এছাড়া, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের তথ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ টার্নস টাইড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ উইথ ফ্লোটিং স্কুলস’ নির্বাচিত হয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর ফাইনালিস্ট হিসেবে।
রেজোয়ানের এই উদ্যোগ স্থান পেয়েছে স্থপতি জুলিয়া ওয়াটসনের বই ‘লো–টেক : ওয়াটার’-এ, যেখানে বিশ্বের ২২টি ঐতিহ্যভিত্তিক আধুনিক উদ্ভাবনের উল্লেখ রয়েছে।
চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি থেকে উঠে আসা এক তরুণের স্থানীয় উদ্ভাবন আজ বিশ্বজুড়ে সাক্ষরতা, স্থাপত্য নকশা ও টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এ অর্জন শুধু রেজোয়ানের নয়, বরং বাংলাদেশের সৃজনশীলতা ও মানবিক উদ্ভাবনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।