এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

গ্রিন কার্ডধারীদের জন্য বন্ধ হচ্ছে মার্কিন ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা

গ্রিন কার্ডধারীদের জন্য বন্ধ হচ্ছে মার্কিন ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণে অভিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য এক বড় ধাক্কা হয়ে এল মার্কিন ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রশাসনের (এসবিএ) নতুন সিদ্ধান্ত। আগামী ১ মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এক নজিরবিহীন নীতিমালায় জানানো হয়েছে যে, গ্রিন কার্ডধারী বা আইনগত স্থায়ী বাসিন্দারা আর কোনো ধরনের সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসা ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই কড়াকড়ির ঘোষণা দেওয়া হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা পরিচালনাকারী অভিবাসীদের জন্য এটি একটি বড় আর্থিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, কারণ দেশটির ক্ষুদ্র অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত এই ঋণ সুবিধা এতদিন প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল।

এসবিএ-র সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো ছোট ব্যবসার ঋণের আবেদন করতে হলে সেই প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মালিকদের শতভাগ মার্কিন নাগরিক হওয়া বাধ্যতামূলক। শুধু নাগরিকত্ব থাকলেই চলবে না, ওই মালিকদের মূল আবাসন বা স্থায়ীভাবে বসবাসের স্থানটিও হতে হবে যুক্তরাষ্ট্র বা এর আওতাধীন কোনো অঞ্চল। এই নতুন নিয়মের অর্থ হলো, যদি কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সামান্য অংশও একজন গ্রিন কার্ডধারীর হাতে থাকে, তবে সেই প্রতিষ্ঠান এসবিএ-র ঋণের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই কঠোর অবস্থানটি মূলত এসবিএ-র স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি ৫০ ১০ ৮ এর নতুন সংস্করণের অংশ হিসেবে জারি করা হয়েছে।

এর আগে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বিদেশি নাগরিক বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী স্থায়ী বাসিন্দারা ব্যবসায়িক ঋণের অংশীদার হতে পারতেন। বিশেষ করে গ্রিন কার্ডধারীদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের সমপরিমাণ না হলেও উল্লেখযোগ্য সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু নতুন এই নীতিমালার মাধ্যমে আগের সেই উদার প্রজ্ঞাপনগুলো বাতিল করা হয়েছে। এসবিএ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আইনি স্থায়ী বাসিন্দা বা লিগ্যাল পার্মানেন্ট রেসিডেন্টরা এখন থেকে সরকারি তহবিল সমৃদ্ধ ঋণ কর্মসূচির আওতায় আসবেন না। এই পরিবর্তনের ফলে হাজার হাজার অভিবাসী পরিচালিত স্টার্টআপ এবং বিদ্যমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসার অবদান অনস্বীকার্য এবং এই খাতের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন অভিবাসীরা। বিশেষ করে টেকনিক্যাল সেবা, খুচরা পণ্য বিক্রয় এবং খাদ্য সরবরাহ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এসবিএ ঋণ ছিল লাইফলাইন। ব্যাংক থেকে সরাসরি বড় ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই নানা জটিলতা থাকে, সেক্ষেত্রে সরকারি গ্যারান্টি থাকায় এসবিএ ঋণের সুদের হার এবং শর্তাবলী অনেক সহজ হতো। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্রিন কার্ডধারী উদ্যোক্তারা এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হারের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবেন, যা তাদের ব্যবসার প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্স এবং অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা শুরু করেছে। তাদের মতে, এটি মূলত দক্ষ উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করার একটি পদক্ষেপ। অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর গ্রিন কার্ড নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং মার্কিন অর্থনীতিতে কর পরিশোধ করছেন। তারা নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই যদি এই ঋণ সুবিধা হারিয়ে ফেলেন, তবে অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন তাদের প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো পুনর্গঠন করার চিন্তাভাবনা করছেন, যাতে করে ১ মার্চের ডেডলাইনের আগে তারা যোগ্য হিসেবে টিকে থাকতে পারেন।

এসবিএ-র এই প্রজ্ঞাপন নিয়ে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতেও ব্যপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেক ঋণদাতা সংস্থা বা ব্যাংক যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়ে কাজ করে, তারা এখন পুরনো আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছে। কারণ নতুন নীতি অনুযায়ী, ১ মার্চের পর থেকে আবেদন করা কোনো ফাইলে গ্রিন কার্ডধারীর নাম থাকলে তা সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই নীতি কেবল নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে, তবে বিদ্যমান ঋণের কিস্তি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না তা এখনো অস্পষ্ট। আগ্রহী ঋণগ্রহীতারা তাদের স্থানীয় এসবিএ ফিল্ড অফিসগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করছেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে যে, মার্কিন প্রশাসন এখন থেকে ঘরোয়া ব্যবসাগুলোর ক্ষেত্রে শতভাগ দেশি নাগরিকত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি হয়তো স্থানীয় কর্মসংস্থান বা জাতীয় পুঁজি রক্ষার একটি কৌশল হতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং দক্ষ অভিবাসীদের আকর্ষণের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় এবং লাতিন আমেরিকান অভিবাসীরা যারা যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষুদ্র ব্যবসার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা এই নীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আসন্ন ১ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নিয়মটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। যারা বর্তমানে নাগরিকত্বের আবেদন করছেন কিন্তু এখনো গ্রিন কার্ড পর্যায়ে রয়েছেন, তাদের জন্য ব্যবসা সম্প্রসারণ করা এখন আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞ মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক বিনিয়োগের গতি কিছুটা ধীর হয়ে আসতে পারে। উদ্যোক্তাদের এখন বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করতে হবে অথবা দ্রুত নাগরিকত্ব লাভের চেষ্টা করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে এই আকস্মিক পরিবর্তন মূলত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির একটি কঠোর প্রতিফলন। গ্রিন কার্ডধারীদের ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অর্থ হলো দেশটিতে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ কর্মক্ষম অভিবাসীকে আর্থিক মূলধারা থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখা। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই নতুন এসবিএ নীতিমালা শুধুমাত্র নাগরিকত্বের ওপর ভিত্তি করে ক্ষুদ্র ব্যবসায় বৈষম্য তৈরি করতে পারে। তবে এটি সত্য যে, সরকারি ঋণের তহবিল শুধুমাত্র মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সরকারি দায়ভার কমার সম্ভাবনা থাকে। এই নীতির প্রভাবে অনেক বড় বড় অভিবাসী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হয়তো এখন তাদের মালিকানা পরিবর্তন করবে বা কৃত্রিমভাবে মার্কিন নাগরিকদের অংশীদার হিসেবে সামনে নিয়ে আসবে, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতাও বাড়াতে পারে।