আজকের জরাজীর্ণ হুইলচেয়ারে বসা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখে হয়তো নতুন প্রজন্মের অনেকের পক্ষেই কল্পনা করা কঠিন সেই সাদা-কালো টেলিভিশনের পর্দায় দেখা রূপসী 'ফার্স্ট লেডি'কে। ক্ষমতার জৌলুস নয়, বরং ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এক দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নাম বেগম খালেদা জিয়া। এক নিভৃতচারী গৃহবধূ থেকে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যার রাজনৈতিক জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে লড়াই, ব্যক্তিগত বিয়োগব্যথা আর অটল দেশপ্রেম।
রাজনীতির আকস্মিক শুরু: সেনানিবাস থেকে রাজপথ
সত্তরের দশকের শেষভাগে খালেদা জিয়া ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবনসঙ্গিনী। রাজনীতি নিয়ে তার কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না; দুই সন্তান তারেক ও কোকোকে নিয়ে সাংসারিক কাজেই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
বিএনপি যখন ভাঙনের মুখে, তখন দলের অস্তিত্ব রক্ষায় ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি। ঘরোয়া জীবন ছেড়ে তিনি বেরিয়ে আসেন রাজপথে। মাইলের পর মাইল হেঁটে মানুষের কাছে পৌঁছে যান তিনি। ১৯৮৩ সালে দলের হাল ধরার পর দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যে আপসহীন নেতৃত্ব তিনি দিয়েছেন, তা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা
১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার আমলেই দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তিত হয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিশেষ করে মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তির প্রবর্তন ছিল তার সময়ের অন্যতম যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং সবকটিতেই অপরাজিত থাকার বিরল রেকর্ড গড়েছেন।
ব্যক্তিগত শোক ও বিচ্ছেদের এক নীলকাব্য
ক্ষমতার রাজমুকুটের আড়ালে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম বেদনাদায়ক। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে তাকে সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত ঘর থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ কারাবাস এবং গৃহবন্দি জীবনের মাঝে তিনি হারিয়েছেন তার আপনজনদের। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার মায়ের মৃত্যু এবং সুদূর মালয়েশিয়ায় ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
ছেলের লাশ যখন দেশে আসে, তখন তিনি অবরুদ্ধ। এক পলক দেখার জন্য যখন কফিন খোলা হয়েছিল, সেই দৃশ্য আজও কোটি মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। অন্যদিকে বড় ছেলে তারেক রহমান রিমান্ডের নির্যাতনে পঙ্গুত্ব বরণ করে আজও প্রবাসে নির্বাসিত।
"এদেশই আমার সব": আপসহীন দেশপ্রেম
বেগম জিয়ার সামনে অনেকবার বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রলোভন ও সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, "বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এদেশই আমার সব।" বর্তমানে তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বার্ধক্য আর অসুস্থতা তাকে শারীরিক ভাবে দুর্বল করলেও, তার রাজনৈতিক আদর্শ আর আপসহীন মনোভাব আজও দেশীয় রাজনীতিতে এক বিশাল শক্তি।
রাজনীতির নিয়তির সন্তান হিসেবে খালেদা জিয়া আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আজ তিনি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়লেও তার লড়াইয়ের ইতিহাস দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।