১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ এবং ‘সম্প্রচার কমিশন’ গঠনের তোড়জোড় নিয়ে সংবাদপত্রের জগতে চরম অস্বস্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদপত্রের সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠন সম্পাদক পরিষদ এই উদ্যোগকে ‘অনভিপ্রেত ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) এক যৌথ বিবৃতিতে পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বর্তমান প্রশাসনের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন। তাদের মতে, নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে এই ধরনের সুদূরপ্রসারী আইন প্রণয়নের চেষ্টা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নতুন কোনো শৃঙ্খল চাপানোর নামান্তর।
ঘটনার নেপথ্য: কেন এই অস্থিরতা?
উল্লেখ্য যে, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর প্রায় ১০ মাস সময় পার হয়ে গেলেও সরকার কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে তেমন তৎপরতা দেখায়নি। অথচ সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ লগ্নে এসে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় গত বুধবার তড়িঘড়ি করে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ খসড়ার ওপর মতামত দেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন দিন। এর ঠিক আগের দিন মঙ্গলবার প্রকাশ করা হয় ‘সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ’। ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসার কথা থাকলেও, এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কেন এমন আইন পাস করার চেষ্টা চলছে, তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্পাদক পরিষদের আপত্তির প্রধান ক্ষেত্রসমূহ
বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ মূলত তিনটি প্রধান দিক তুলে ধরেছে:
সময়ের প্রাসঙ্গিকতা: নির্বাচন যখন সন্নিকটে, তখন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে? পরিষদ মনে করে, এটি কোনো জরুরি কাজ নয় যা নতুন সরকার গঠনের আগে শেষ করতে হবে।
অংশগ্রহণমূলক চর্চার অভাব: মাত্র তিন দিনের সময়সীমা দিয়ে অংশীজনদের (সাংবাদিক, সম্পাদক ও নাগরিক সমাজ) মতামত নেওয়া কার্যত একটি লোকদেখানো প্রক্রিয়া। এটি গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা: খসড়া অধ্যাদেশটির কাঠামো বিশ্লেষণ করে সম্পাদক পরিষদ জানিয়েছে, সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার চেয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা খবরদারি করার সুযোগ বেশি রাখা হয়েছে।
খসড়া অধ্যাদেশের বিতর্কিত দিকসমূহ
১. গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের অবজ্ঞা:
সরকার নিজেই যে সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, তাদের দীর্ঘ গবেষণা ও সুপারিশগুলো পাশ কাটিয়ে এই নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটি কমিশনের কাজের প্রতি অমর্যাদা এবং সংস্কারের মূল স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক।
২. তাড়াহুড়ো ও অস্বচ্ছতা:
আইন প্রণয়নের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে মতবিনিময় করা। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয় যে পদ্ধতিতে এগোচ্ছে, তাতে কোনো অর্থবহ আলোচনার সুযোগ রাখা হয়নি। সম্পাদক পরিষদের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে তড়িঘড়ি নয়; বরং স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল প্রক্রিয়াই কাম্য।
৩. সম্প্রচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ:
আলাদা দুটি কমিশন (গণমাধ্যম ও সম্প্রচার) গঠনের ফলে কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের বোঝা চেপে বসতে পারে। বিশেষ করে সম্প্রচার কমিশন যদি নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে, তবে সংবাদ পরিবেশনে সরকারের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপট
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বিদায়ী সরকার সাধারণত কেবল রুটিন কাজগুলো সম্পন্ন করে থাকে। নীতি-নির্ধারণী বা এমন কোনো আইন প্রণয়ন তারা করে না যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ম্যান্ডেটকে প্রভাবিত করতে পারে। সম্পাদক পরিষদ জোরালোভাবে বলেছে যে, এই ধরনের আইন প্রণয়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। সেখানেই নাগরিক প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সাথে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও কল্যাণকর আইন তৈরি হওয়া সমীচীন।
অধ্যাদেশের এই খসড়া নিয়ে দেশের গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ এবং সংবিধানিক আইনবিদরা তাদের অভিমত প্রদান করেছেন। তাদের বিশ্লেষণের প্রধান অংশগুলো নিচে দেওয়া হলো:
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আধুনিকায়ন: বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি সত্যিই গণমাধ্যমের মানোন্নয়ন চাইত, তবে তারা গত ১০ মাস সময়কে কাজে লাগাতে পারত। এখন নির্বাচনের ঠিক আগে মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতাকে এক ধরণের 'আমলাতান্ত্রিক খাঁচায়' বন্দি করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সংসদীয় সার্বভৌমত্ব বনাম অধ্যাদেশ: আইনবিদরা মনে করেন, নির্বাচিত সরকার আসার এক সপ্তাহ আগে অধ্যাদেশ জারি করা আইনিভাবে বৈধ হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল। একটি স্বাধীন দেশের গণমাধ্যম কীভাবে চলবে, তা কোনো মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে আসা তিন দিনের নোটিশে ঠিক হতে পারে না। এটি নিয়ে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বনাম নিরাপত্তা: খসড়াটিতে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় সরকারের নিরঙ্কুশ আধিপত্য রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অংশীজনদের উপেক্ষা: সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সম্পাদকদের সংগঠনগুলোকে পাশ কাটিয়ে করা যেকোনো আইন শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় না। বিশ্লেষকদের দাবি—সরকারকে অবিলম্বে এই তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে এই দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে যাতে একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক আইন তৈরি হয়।
সম্পাদক পরিষদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ বা নিয়ন্ত্রণের যেকোনো অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অপরিহার্য। তড়িঘড়ি কোনো অধ্যাদেশ বা একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্য এবং সকল অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার ভিত্তিতেই এমন গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা সম্ভব। একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়াই কেবল দেশ ও গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।