আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি এই গণভোটে হ্যাঁ বা না—কোনো পক্ষেই সরাসরি প্রচারণা চালাতে পারবেন না। ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নির্দেশনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত মূলত গণভোটের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সরকারি পদের অপব্যবহার রোধ করার একটি আইনি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা কেবল জনগণকে ভোট প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। এর বাইরে কোনো পক্ষ নিয়ে ভোট প্রদানের আহ্বান জানানো তাদের জন্য আইনত নিষিদ্ধ। কমিশন মনে করছে, সরকারি কর্মকর্তারা যদি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে প্রচারণায় অংশ নেন, তবে তা ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে এবং ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের প্রশ্নে দেশজুড়ে গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে অর্থাৎ হ্যাঁ ভোটের সমর্থনে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোও এই প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীরা কোনো নির্দিষ্ট একটি পক্ষের হয়ে প্রচার চালাতে পারেন কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘ দিন ধরে বিতর্ক চলছিল। নির্বাচন কমিশনের এই নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে সেই বিতর্কের একটি আইনি সমাধান আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আইনি বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে কমিশন জানিয়েছে যে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮৬ ধারা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কোনো ব্যক্তি যদি তার পদমর্যাদার অপব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তবে তার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন এক বছর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারায় সংসদ নির্বাচনের মতোই যাবতীয় আচরণবিধি ও অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া একই রাখা হয়েছে। ফলে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের মতো সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণও এখন ইসির বিশেষ নজরদারিতে থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সরকারি যন্ত্রের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু সরকার নিজেই এখানে একটি পক্ষের হয়ে কাজ করছে, তাই প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ থাকতে পারে। নির্বাচন কমিশনের এই প্রজ্ঞাপন সেই চাপ থেকে কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেবে এবং একটি প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তবে মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনা কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে অনেক মহলে কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে যখন বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সভা-সেমিনার শুরু করে দিয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রজাতন্ত্রের সেবকরা জনগণের আস্থা ভাজন। তারা যদি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক পক্ষ নেন, তবে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। সেই সংকট নিরসনেই আইন প্রয়োগের এই কড়াকড়ি। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা যে কোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তাৎক্ষণিক তদন্ত করতে পারেন। ভোটারদের মনে যাতে কোনো প্রকার বিভ্রান্তি না থাকে যে সরকার বা প্রশাসন তাদের কোনো নির্দিষ্ট দিকে চালিত করছে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে গণভোটের এই কঠোর বিধিমালা নির্বাচনী উৎসবকে আরও স্বচ্ছ করে তুলবে বলে কমিশন আশা প্রকাশ করছে।