আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভাবনীয় দিন হতে যাচ্ছে। ওই দিন কেবল সাধারণ নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হবে না, বরং দীর্ঘ সময় পর দেশের মানুষ একটি গণভোটে বা রেফারেন্ডামে অংশ নেবে। একটি প্রশ্নের অধীনে চারটি দফা রাখা হয়েছে, যেখানে উত্তর দিতে হবে একটিই— 'হ্যাঁ' অথবা 'না'। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই পদক্ষেপকে 'ফ্যাসিবাদ রুখে দেওয়ার' এবং 'সংস্কারের পক্ষে' জনমত গঠনের এক মহা-আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি প্রচারণায় জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানেই পরিবর্তনের পথে হাঁটা। কিন্তু এই ‘হ্যাঁ’ ভোট জেতার পর বাস্তব চিত্র আসলে কেমন হবে, তা নিয়ে জনমনে যেমন ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা সংশয় ও প্রশ্ন। দ্য ডেইলি স্টার-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এই গণভোটের নেপথ্যের জটিল সমীকরণগুলো উঠে এসেছে, যা আমাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ বুঝতে সাহায্য করে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে যেসব পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তার একটি দীর্ঘ তালিকা সরকারি প্রচারপত্রে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশন গঠনে সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং এককভাবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা হ্রাস করা। এছাড়া আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে যেমন— প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ইন্টারনেটের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো আধুনিক প্রস্তাবও এতে স্থান পেয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রচারণার সবটুকু যেমন সত্য নয়, তেমনি সবটুকুই আবার আইনত নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ ২০২৫’-এর আলোকে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অনেক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো ঐকমত্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। অতীতে বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের যে বিধান ছিল, তা বারবার সংকটের জন্ম দিয়েছে। জুলাই সনদে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন কিছু অপশনের কথা বলা হলেও সেখানে বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছে। একইভাবে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং বাংলাদেশ নিজামী ইসলাম পার্টির মতো দলগুলো দ্বিমত পোষণ করেছে। এমনকি যারা বাহ্যিকভাবে এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছে, তারাও এই নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলের কোনো নারী ক্যান্ডিডেট না থাকাটা এই সংস্কার প্রস্তাবের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়া মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের বিষয়টি জুলাই সনদে এখনো অস্পষ্ট এবং তা ভবিষ্যৎ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
গণভোটের আইনি ভিত্তি দিতে সরকার দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। বর্তমানে সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান না থাকায় এই অধ্যাদেশগুলোর মাধ্যমেই ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট গ্রহণের আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে যা হবে তা হলো— নবনির্বাচিত ৩শ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে। অর্থাৎ যারা এমপি হিসেবে নির্বাচিত হবেন, তারাই এই পরিষদের সদস্য হবেন। এই পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করবে। এই ‘১৮০ কার্যদিবস’ শব্দবন্ধ থেকেই ধারণা করা হচ্ছে যে সরকারের মেয়াদ হয়তো আরও ছয় মাস বা তার বেশি বাড়ছে। কারণ কার্যদিবস হিসেবে ধরলে ছুটির দিন ও উৎসব মিলিয়ে এই সময়কাল অনায়াসেই আট মাস বা তার বেশি হয়ে যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই পরিষদ সম্পূর্ণ স্বাধীন। গণভোটে মানুষ ‘হ্যাঁ’ বললেও নবনির্বাচিত এমপিরা সেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাধ্য কি না, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের অভিমত
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সাংবিধানিক বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই গণভোট আসলে একটি রাজনৈতিক ‘ম্যান্ডেট’ সংগ্রহের চেষ্টা। সাধারণত অন্যান্য দেশে গণভোট হয় তখন, যখন কোনো প্রস্তাব পার্লামেন্টে বিস্তারিত আলোচনার পর পাস হয় এবং তারপর তা জনগণের সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে হচ্ছে তার উল্টো—আগে জনগণের সম্মতি নেওয়া হচ্ছে, তারপর তা পার্লামেন্টে আলোচনার জন্য পাঠানো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। যেহেতু জনগণ একটি মাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবে, তাই কোন নির্দিষ্ট দফার ওপর মানুষের সমর্থন কতটুকু, তা বোঝার কোনো উপায় থাকবে না। হতে পারে কেউ প্রধানমন্ত্রীর ১০ বছরের মেয়াদের পক্ষে কিন্তু উচ্চকক্ষ গঠনের বিপক্ষে, তবুও তাকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ এর যেকোনো একটি বেছে নিতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, এই সংস্কারের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে পরবর্তী নির্বাচিত পার্লামেন্টের মর্জির ওপর। নির্বাচিত সংসদ সবসময়ই সার্বভৌম এবং তারা চাইলে গণভোটের এই প্রস্তাবগুলোকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। তাই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই ফ্যাসিজম চিরতরে বিদায় নেবে বা সব সংস্কার রাতারাতি হয়ে যাবে—এমন গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার সূচনা মাত্র। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই গণভোটের আসল উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সংস্কার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে। তবে শেষ পর্যন্ত জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কতটা ঘটবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক সততার ওপর। ১২ ফেব্রুয়ারির এই লড়াই তাই কেবল সরকার গঠনের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের সংবিধানের কাঠামোগত রূপান্তরের এক অনিশ্চিত কিন্তু সাহসী যাত্রার শুরু।