ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু: জাতির উদ্দেশে জামায়াত আমির

ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু: জাতির উদ্দেশে জামায়াত আমির

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে প্রচারিত এই ভাষণে তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম দিন ফজরের নামাজ আদায় শেষে দলীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে জামায়াতে ইসলামী।

বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাংলাদেশের অঙ্গীকার

ভাষণের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবাই নির্ভয়ে বসবাস করবে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও ওপর আঘাত এলে আমরা তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করব।” তিনি আরও যোগ করেন, দেশে মা-বোনদের নিরাপত্তা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে যাতে কাউকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে না হয়।

রাষ্ট্র সংস্কার ও তরুণদের ভূমিকা

তরুণ প্রজন্মকে একটি নতুন বাংলাদেশের স্থপতি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, পরিবর্তনের পথে তরুণদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দায়িত্ব তাদের হাতেই তুলে দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে কিছু সংস্কার হলেও অনেক মৌলিক পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আর এই কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতেই নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও পররাষ্ট্র নীতি

বিগত শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের শাসকরা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, সমমর্যাদার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিটিভি ও বেতারে প্রচারিত ডা. শফিকুর রহমানের এই ভাষণটি জামায়াতে ইসলামীর জন্য এক ঐতিহাসিক মোড়। এক সময় কোণঠাসা অবস্থায় থাকা দলটি এখন রাষ্ট্রের মূল ধারার রাজনীতিতে সংলাপে ফিরছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে তার উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং নারী অধিকার নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মূলত বিশ্ব সম্প্রদায় ও সাধারণ ভোটারদের মনে থাকা সংশয় দূর করার একটি কৌশলগত প্রয়াস। তবে দীর্ঘ দেড় দশকের ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণের সামনে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ ও ‘গণভোট’ আয়োজনের যে চ্যালেঞ্জ, তাতে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষা হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বের বিপরীতে ডা. শফিকুর রহমানের এই ‘ফজরের নামাজ শেষে কাজ শুরু’ করার ঘোষণাটি ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ ভোটারদের কাছে একটি নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটাররা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হিসেবে জামায়াতের এই ‘নতুন রূপ’কে কতটা গ্রহণ করবে, তা জানা যাবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী ব্যালট যুদ্ধেই।