এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৫৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ওয়াশিংটনের হুকুমদারি বনাম ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব: কারাকাসে নতুন সংঘাতের পদধ্বনি

ওয়াশিংটনের হুকুমদারি বনাম ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব: কারাকাসে নতুন সংঘাতের পদধ্বনি

ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক দুঃসাহসিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় পতন এবং আটকের তিন সপ্তাহ পর, দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। গত রবিবার পুয়ের্তো লা ক্রুজে তেল শ্রমিকদের এক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলা আর ওয়াশিংটনের পুতুল হয়ে থাকবে না।

সংক্ষিপ্ত মূলবিন্দু:

বিদ্রোহী সুর: ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের সরাসরি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন।

মাদুরোর বিচার: সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বর্তমানে নিউইয়র্কে মাদক পাচারের অভিযোগে মার্কিন হেফাজতে বিচারের মুখোমুখি।

তেল দখল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের একটি বড় অংশ আমেরিকা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবে।

মাচাদো ফ্যাক্টর: ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদোর সাথে ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।

তেলের দখল এবং একটি দেশের ভাগ্য

১. রদ্রিগেজের হুঁশিয়ারি: "যথেষ্ট হয়েছে!"

পুয়ের্তো লা ক্রুজের তেল শোধনাগারে সমবেত হাজার হাজার শ্রমিকের সামনে দেলসি রদ্রিগেজ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মার্কিন প্রশাসনের সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি বলেন, "ভেনেজুয়েলার রাজনীতিকদের ওপর ওয়াশিংটনের হুকুমদারিতে এবার ইতি টানার সময় এসেছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আমাদেরই মিটিয়ে নিতে দিন। এই প্রজাতন্ত্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে অনেক চড়া মূল্য দিয়েছে।"

রদ্রিগেজ এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে "শক্তিশালী নেতা" হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতায় থাকার সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। রদ্রিগেজের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, ভেনেজুয়েলার ভেতরকার রাজনৈতিক শক্তিগুলো মার্কিন আধিপত্যকে সহজে মেনে নিচ্ছে না।

২. মাদুরোর আটক এবং ট্রাম্পের ‘গ্রেট আমেরিকান’ পরিকল্পনা

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে কারাকাসে এক গোপন সামরিক অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে সরাসরি নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার পর ট্রাম্প এয়ারফোর্ড ওয়ানে বসে সাংবাদিকদের জানান যে, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এখন থেকে আমেরিকার ট্যাক্স কমাতে সাহায্য করবে। ট্রাম্পের ভাষায়, "আমরা তাদের তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেব। এতে আমেরিকা ধনী হবে এবং ভেনেজুয়েলাও আগের চেয়ে ভালো করবে।" ট্রাম্পের এই "ফেয়ার শেয়ার" নীতি কার্যত ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারই নামান্তর।

৩. মারিয়া করিনা মাচাদো এবং নোবেল পুরস্কারের রাজনীতি

ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী এবং ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো এখন ওয়াশিংটনের বিশেষ প্রিয়পাত্র। গত ১৫ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে তার বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মাচাদো তার নোবেল শান্তি পুরস্কারটি ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপন করেন—যে পুরস্কারটি ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে নিজের জন্য আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। ট্রাম্প এখন মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেত্রী হিসেবে বিবেচনা করছেন, যা রদ্রিগেজ প্রশাসনের জন্য বড় হুমকি।

ভেনেজুয়েলা কি দ্বিতীয় লিবিয়া হতে চলেছে?

ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি সরকার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পরাশক্তির সরাসরি অধিকার প্রতিষ্ঠার এক নব্য-ঔপনিবেশিক প্রচেষ্টা।

অর্থনৈতিক যুদ্ধের নতুন রূপ: ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এখন "অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ" দ্বারা চালিত। ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের পর তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা এবং মুনাফা ভাগাভাগি করার পরিকল্পনাটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হলেও ট্রাম্প তা "ন্যায্য" বলে দাবি করছেন। রদ্রিগেজ যখন বলেন যে "যথেষ্ট হয়েছে", তখন তিনি মূলত সেই লক্ষ লক্ষ ভেনেজুয়েলানদের প্রতিনিধিত্ব করেন যারা মনে করেন তাদের দেশের সম্পদ লুট হচ্ছে।

রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ক্ষমতার লড়াই:

মাদুরো নেই, কিন্তু মাদুরোর আদর্শ এখনো ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী ও শ্রমিক শ্রেণির গভীরে প্রোথিত। রদ্রিগেজ সেই সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দরকষাকষি করছেন। অন্যদিকে, মাচাদোকে সামনে রেখে আমেরিকা একটি সিভিলিয়ান অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভেনেজুয়েলার রাজনীতি কখনোই সরলরেখায় চলেনি। যদি আমেরিকা সরাসরি তেলের দখল নেয়, তবে দেশটিতে একটি দীর্ঘমেয়াদী শ্রমিক বিদ্রোহ বা গেরিলা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

২০২৬-এর ভূ-রাজনীতি:

রাশিয়া ও চীনের নিরবতা এই সংকটে রহস্যজনক। মাদুরোর আটকের পর তারা তীব্র প্রতিবাদ জানালেও সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি। তবে রদ্রিগেজ যদি মার্কিন বিরোধী অবস্থান আরও শক্ত করেন, তবে কারাকাস আবারও মস্কো বা বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

ভবিষ্যৎ গতিপথ

ভেনেজুয়েলা এখন এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক খবরদারি, অন্যদিকে রদ্রিগেজের নেতৃত্বে টিকে থাকার লড়াই। তেলের ব্যারেল যখন রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। আগামী কয়েক সপ্তাহ কারাকাসের রাজপথ এবং ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস থেকে আসা প্রতিটি বার্তা বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মানচিত্র তৈরি করবে।