২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি আমেরিকার অভিবাসন ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে গণ্য হতে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন এক চরমপন্থী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দেশটির গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ বা আইস (ICE)-এর একটি অভ্যন্তরীণ মেমো ফাঁস করেছে। এই মেমোটি কেবল একটি সাধারণ নির্দেশিকা নয়, বরং এটি অভিবাসী শিকারের এক নতুন ‘লাইসেন্স’।
এই মেমোতে বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ের সাধারণ আইস এজেন্টদের এখন থেকে কোনো বিচারকের স্বাক্ষর করা গ্রেফতারি পরোয়ানা বা ওয়ারেন্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়েই তারা যেকোনো মানুষকে রাজপথ থেকে তুলে নিতে পারবেন। মিনিয়াপোলিসে এজেন্টদের গুলিতে দুইজনের মৃত্যুর পর যখন দেশ উত্তাল, ঠিক তখনই এই গোপন নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়েছে।
আইনি মারপ্যাঁচ: ‘পালিয়ে যাওয়া’র অদ্ভুত এক সংজ্ঞা
ফেডারেল আইনের অধীনে এতদিন পর্যন্ত আইস এজেন্টদের ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। আইনত তাদের প্রমাণ করতে হতো যে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি গ্রেফতারি পরোয়ানা পাওয়ার আগেই "পালিয়ে যেতে পারেন" (Likely to escape)।
আইস-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টড এম. লায়ন্স তার নতুন মেমোতে এই সংজ্ঞাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন। আগে ‘পালিয়ে যাওয়া’ বলতে বোঝানো হতো যে ব্যক্তিটি দেশ ছেড়ে পালাবেন বা স্থায়ীভাবে আত্মগোপন করবেন। কিন্তু লায়ন্স লিখেছেন, এটি একটি "ভুল ব্যাখ্যা"। তার নতুন ব্যাখ্যা অনুযায়ী—যদি একজন এজেন্ট মনে করেন যে তিনি যখন প্রশাসনিক ওয়ারেন্ট তৈরি করতে যাবেন, সেই সময়ের মধ্যে ব্যক্তিটি ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে পারেন (যেমন রাস্তা থেকে অন্য গলিতে ঢুকে পড়া), তবেই তাকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে।
এর অর্থ হলো, মার্কিন নাগরিকদের মতো অভিবাসীদের আর কোনো আইনি সুরক্ষা রইল না। একজন সাধারণ আইস এজেন্ট এখন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কে "পালিয়ে যেতে পারে" আর কে পারে না।
অপারেশন ‘থান্ডার’: শহরজুড়ে মুখোশধারী এজেন্টদের তাণ্ডব
বর্তমান প্রশাসনের নির্দেশে নিউইয়র্ক, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং মিনিয়াপোলিসের মতো শহরগুলোতে হাজার হাজার মুখোশধারী আইস এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। এরা কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা টার্গেট ছাড়াই জনবহুল এলাকাগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে। আগে যেখানে কেবল নির্দিষ্ট অপরাধীদের তালিকা ধরে অভিযান চলত, এখন সেখানে চলছে ‘ইন্ডিসক্রিমিনেট সুইপ’ বা নির্বিচার চিরুনি তল্লাশি।
বিশেষ করে হোম ডিপোর মতো বড় দোকানের পার্কিং লট, যেখানে দিনমজুররা কাজের সন্ধানে জড়ো হন, সেখানে আইস এজেন্টরা অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে। তাদের হাতে কোনো জুডিশিয়াল ওয়ারেন্ট থাকছে না। মেমোতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইস অফিসাররা কেবল ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়ারেন্ট’ ব্যবহার করেই মানুষের ব্যক্তিগত বাসস্থানেও প্রবেশ করতে পারবেন, যার জন্য কোনো বিচারকের অনুমতির প্রয়োজন নেই।
মূল পরিবর্তনের বিস্তারিত রূপরেখা
এই নতুন নীতির ফলে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় যে আমূল পরিবর্তনগুলো এসেছে, তা নিচে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:
গ্রেফতারের ক্ষমতা ও মানদণ্ড: আগে আইস এজেন্টদের গ্রেফতারের জন্য সুনির্দিষ্ট কারণ (Probable Cause) দেখাতে হতো যে ব্যক্তিটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এখন সেই মানদণ্ড কমিয়ে আনা হয়েছে স্রেফ "পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা"র ওপর। অর্থাৎ, এজেন্টের ব্যক্তিগত ধারণাই এখন শেষ কথা।
বিচার বিভাগীয় নজরদারির অবসান: মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় সাধারণত একজন নিরপেক্ষ বিচারক প্রমাণের ভিত্তিতে ওয়ারেন্টে সই করেন। কিন্তু নতুন নির্দেশনায় আইস-কে এই প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এখন আইস-এর নিজস্ব কর্মকর্তারাই নিজেদের জন্য ওয়ারেন্ট ইস্যু করছেন।
কোল্যাটারাল বা আনুষঙ্গিক গ্রেফতার: আইস এজেন্টরা যখন একজনকে গ্রেফতার করতে গিয়ে তার আশেপাশে থাকা অন্য ব্যক্তিদেরও কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই তুলে নিয়ে আসেন, তখন তাকে বলা হয় ‘কোল্যাটারাল অ্যারেস্ট’। লায়ন্সের মেমোতে এই ধরণের গ্রেফতারকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
তদন্ত ছাড়াই সাজা: আগে গ্রেফতারের আগে ব্যক্তির পারিবারিক অবস্থা বা কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড আছে কি না তা দেখা হতো। এখন অন-দ্য-স্পট বা ঘটনাস্থলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তির কোনো পরিচয়পত্র না থাকলেও তাকে সরাসরি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে।
এটি কি সংবিধানের মৃত্যুঘণ্টা?
মানবাধিকার কর্মী এবং সাবেক আইস নীতিনির্ধারকরা এই মেমোকে আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ‘একনায়কতান্ত্রিক’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সাবেক আইস নীতি নির্ধারক স্কট শুচার্ট বলেছেন, এই মেমোটি সরাসরি আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তার মতে, "এটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে আইস এজেন্টদের হাতে অসীম ক্ষমতা। তারা এখন যেকোনো ছুতোয় যেকোনো অভিবাসীকে রাস্তা থেকে গায়েব করে দিতে পারে।"
অন্যদিকে, সাবেক সিনিয়র অ্যাডভাইজার ক্লেয়ার ট্রিকলার-ম্যাকনাল্টি মনে করেন, "লাইকলি টু এস্কেপ" শব্দটির এই ব্যাখ্যা মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর লঙ্ঘন। তিনি বলেন, "যদি পালিয়ে যাওয়ার অজুহাতে সবসময়ই ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করা যায়, তবে সংবিধানের আর প্রয়োজন কোথায়?"
মিনিয়াপোলিস ট্র্যাজেডি ও ট্রাম্পের দ্বিমুখী ভূমিকা
এই মেমোটি প্রকাশের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে মিনিয়াপোলিসে এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। সেখানে আইস-এর অভিযানে দুই অভিবাসী প্রাণ হারান। সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনসমক্ষে বলেন যে তিনি অভিযান কিছুটা "শিথিল" করবেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে লায়ন্সের এই মেমো প্রমাণ করে যে, প্রশাসন আসলে অভিযান কমানো নয়, বরং আরও হিংস্র করার নির্দেশ দিয়েছে।
এজেন্টদের বলা হয়েছে, যারা গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করবে বা সঠিক তথ্য দেবে না বলে সন্দেহ করা হবে, তাদের প্রতি কোনো দয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই। এমনকি যাদের কাছে ভুয়া নথিপত্র থাকার ‘সন্দেহ’ হবে, তাদেরও সাথে সাথে হাজতে ভরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইস এজেন্টদের জন্য নির্দেশিত ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সন্দেহের কারণসমূহ
মেমোতে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উল্লেখ আছে যা দেখে এজেন্টরা ওয়ারেন্ট ছাড়াই কাউকে ধরতে পারবেন:
১. কেউ যদি এজেন্টের উপস্থিতি দেখে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে।
২. যদি কারো কাছে গাড়ি বা দ্রুত পালানোর মতো যানবাহন থাকে।
৩. যদি কেউ নিজের ঠিকানা বা পরিচয় সম্পর্কে অস্পষ্ট তথ্য দেয়।
৪. যদি কারো আচরণে ভয় বা নার্ভাসনেস প্রকাশ পায়।
৫. যদি কেউ আগে কখনও অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করে থাকে বলে এজেন্ট ‘মনে’ করেন।
এই পয়েন্টগুলো অত্যন্ত বিতর্কিত, কারণ যেকোনো সাধারণ মানুষ বন্দুকধারী এজেন্ট দেখে আতঙ্কিত হতে পারেন। আর এই আতঙ্ককেই এখন আইনিভাবে গ্রেফতারের ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিণাম
আমেরিকার এই নতুন অভিবাসন নীতি কেবল ১০-১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসীর জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি পুরো মার্কিন বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি অশনি সংকেত। যখন একটি প্রশাসনিক সংস্থা বিচার বিভাগকে এড়িয়ে নিজের ইচ্ছামতো গ্রেফতার শুরু করে, তখন তাকে আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা চলে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই গণ-গ্রেফতার অভিযানের ফলে মার্কিন অর্থনীতিতেও ধস নামতে পারে। কৃষি, নির্মাণ এবং সেবা খাতের বিশাল অংশ এই অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে, আইস (ICE)-এর এই নতুন ক্ষমতা প্রয়োগ আসলে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। এটি কেবল অভিবাসী তাড়ানো নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করার কৌশল। যদি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এই মেমোর বিষয়ে দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমেরিকার রাজপথ ভবিষ্যতে আরও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সাক্ষী হতে পারে। আইনের রক্ষকরাই যখন আইন ভাঙার লাইসেন্স পায়, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার কেবল কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকে।