এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৮ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

এক শরণার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু ও মার্কিন অভিবাসন নীতির ‘অমানবিক’ রূপ

এক শরণার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু ও মার্কিন অভিবাসন নীতির ‘অমানবিক’ রূপ

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক স্টেটের বাফেলো শহরে ৫৬ বছর বয়সী এক প্রায় অন্ধ শরণার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছে মার্কিন রাজনীতি ও মানবাধিকার অঙ্গন। দীর্ঘ এক বছর জেল খাটার পর ফেডারেল এজেন্টদের মাধ্যমে মুক্তি পেয়ে একটি কফি শপের সামনে একা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পাঁচ দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে ‘প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু’ হিসেবে বর্ণনা করে স্থানীয় ও স্টেট পর্যায়ের কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: একটি কফি শপ এবং পাঁচটি নিখোঁজ দিন

নুরুল আমিন শাহ আলম ইংরেজি বলতে পারতেন না এবং তার দৃষ্টিশক্তি ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এরি কাউন্টি জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বর্ডার পেট্রোল এজেন্টরা তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে একটি কফি শপের সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। বাফেলো পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে সেই কফি শপ থেকে প্রায় চার মাইল দূরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

নিখোঁজ হওয়ার এই পাঁচ দিন হিমাঙ্কের নিচে থাকা প্রচণ্ড শীতের মধ্যে একাকী ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন এই অন্ধ বৃদ্ধ। বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় একটি মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং শত শত মানুষের উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়। তবে তার মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, তার উত্তর এখনো মেলেনি।

সিবিপি-র দাবি বনাম মেয়রের ক্ষোভ

ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)-র একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, এজেন্টরা আলমকে একটি ‘সৌজন্যমূলক লিফট’ দিয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, “তিনি নিজেই একটি কফি শপে নামতে চেয়েছিলেন যা তার পরিচিত ঠিকানার কাছে ছিল। তার মধ্যে কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন দেখা যায়নি।”

তবে বাফেলো মেয়র শন রায়ান এই দাবিকে ‘অমানবিক’ ও ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মেয়র বলেন, “বর্ডার পেট্রোল অফিসারদের কাছে এমন একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোনো প্রটোকল ছিল না যিনি ইংরেজি জানেন না এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা তাকে একটি বন্ধ কফি শপের সামনে ফেলে রেখে আসে। এটি কেবল খারাপ পুলিশিং নয়, এটি অমানবিকতা।”

মেয়রের তথ্য অনুযায়ী, যখন আলমকে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার পায়ে জুতোও ছিল না; ছিল কেবল জেলখানা থেকে দেওয়া পাতলা ‘অরেঞ্জ বুটি’। সে সময় আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত বৈরী—হালকা তুষারপাত এবং হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রা।

এক বছরের কারাবাস: একটি ভুল বোঝাবুঝির মাশুল

নুরুল আমিন শাহ আলমের এই ট্র্যাজেডি শুরু হয়েছিল এক বছর আগে। মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট থেকে পালিয়ে আসা এই শরণার্থী (যিনি সে দেশের রাষ্ট্রহীন সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য) তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে উন্নত জীবনের আশায় আমেরিকায় এসেছিলেন। কিন্তু ইংরেজি না জানা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

তার ছেলে মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, গত বছর একদিন আলম হাঁটতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। একটি জানালার পর্দা টাঙানোর রডকে লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে তিনি হাঁটছিলেন। পুলিশ তাকে থামতে বললেও তিনি ভাষা না বোঝায় রডটি ফেলেননি। পুলিশ তাকে অপরাধী ভেবে স্টান গান ব্যবহার করে এবং মাটিতে আছড়ে ফেলে হাতকড়া পরায়। এই ঘটনার জেরে তাকে পুলিশের ওপর হামলা ও অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

দীর্ঘ এক বছর তিনি বিনা বিচারে জেলে ছিলেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি তার জামিন মঞ্জুর করার পর তাকে বর্ডার পেট্রোল এজেন্টদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যার শেষ পরিণতি হলো এই মর্মান্তিক মৃত্যু।

বিশ্লেষক অভিমত: ব্যবস্থার বলি যখন মানুষ

নুরুল আমিনের এই মৃত্যু মার্কিন বিচার ও অভিবাসন ব্যবস্থার এক গভীর ক্ষতকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে তিনটি বিষয় বিশ্লেষণ করা জরুরি:

১. ভাষা ও প্রতিবন্ধকতার অবজ্ঞা: আলম ইংরেজি জানতেন না এবং চোখে দেখতেন না। ফেডারেল এজেন্টরা তাকে একটি কফি শপে নামিয়ে দেওয়ার সময় তার এই অসহায়ত্বকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন। একজন অন্ধ মানুষ কীভাবে একা নিজের গন্তব্য খুঁজে নেবেন, সেই সাধারণ বিবেচনাটুকুও এখানে অনুপস্থিত ছিল।

২. প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা: আলম যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন। অথচ জেলের নথি বা বর্ডার পেট্রোলের তথ্যে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। এমনকি তাকে যখন কফি শপে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার আইনজীবী বা পরিবার কাউকেই জানানো হয়নি। এই গাফিলতিকে মেয়র ‘অমানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

৩. নিরাপত্তার নামে নিষ্ঠুরতা: বাফেলো শহরের ‘গুড নেইবার’ বা ভালো প্রতিবেশী হওয়ার যে সুখ্যাতি আছে, এই ঘটনা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পুলিশের ওপর হামলার যে অভিযোগ আলমের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তা ছিল স্রেফ ভাষা না বোঝার কারণে সৃষ্ট একটি ভুল বোঝাবুঝি। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন শরণার্থীকে এক বছর জেল খাটানো এবং পরবর্তীতে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া বিচারব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা।

নুরুল আমিন শাহ আলমের মৃত্যু বাফেলো এবং পুরো নিউ ইয়র্ক স্টেটের জন্য এক সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, অভিবাসন ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে তার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। পরিবার এখন কেবল তার মৃত্যুর কারণ নয়, বরং এই অমানবিক আচরণের বিচার চাইছে।