ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং বেকারত্বের প্রতিবাদে শুরু হওয়া তরুণদের আন্দোলন রাজধানী নয়াদিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান এই বিক্ষোভকে সাম্প্রতিক সময়ে মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় যুব আন্দোলনগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থী ও তরুণরা অংশ নিচ্ছেন। জাত, ধর্ম, ভাষা কিংবা আঞ্চলিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আন্দোলনটি একটি সর্বভারতীয় রূপ নিয়েছে।
গত বুধবার নয়াদিল্লির পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের মুম্বাই, কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু, বিহারের পাটনা এবং মিজোরামে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। পাটনায় শিক্ষার্থীদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। তবে আন্দোলনকারীরা দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন।
আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী গত মঙ্গলবার আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে বুধবার সংসদে কালো পোশাক পরে উপস্থিত হন। তিনি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, গত এক দশকে ১৫৪টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও কোনো ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন।
অন্যদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস। তবে সিজেপির নেতারা কোনো মন্ত্রীর কার্যালয় বা সরকারি বাসভবনে বৈঠকে অংশ নিতে রাজি নন। সংগঠনটির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, আলোচনার জন্য যন্তর মন্তরের মতো নিরপেক্ষ স্থান বেছে নিতে হবে।
এদিকে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশনরত রয়েছেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি জানিয়েছেন, সরকার যদি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে তিনি অনশন ভাঙার কথা ভাববেন।
পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগে দিল্লি হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট আবেদন করা হয়েছে। আদালত কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের কাছে জবাব তলব করে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।
মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকট
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকার একাধিক বড় আন্দোলনের মুখোমুখি হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই কোনো না কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু বর্তমান আন্দোলনটি ব্যতিক্রম।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের মতো বিষয় সরাসরি দেশের কোটি কোটি পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জীবনের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় আন্দোলনটি ব্যাপক জনসমর্থন পাচ্ছে। ফলে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় এএফপিকে বলেন, সরকার এই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে পারছে না। আবার শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দিলে সেটিকে সরকারের নতিস্বীকার হিসেবে দেখা হতে পারে, যা নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
‘ককরোচ’ প্রতীকের পেছনের গল্প
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের অনেকেই আটক ও পুলিশি নির্যাতনের পরও আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছেন। ১৯ বছর বয়সী আন্দোলনকারী পূজা কুশি বলেন, সরকার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছে।
আরেক আন্দোলনকারী সীমা যাদব অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁকে ও তাঁর মেয়েকে জোরপূর্বক টেনে নিয়ে যায় এবং তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে মুক্তি পেয়েই তিনি আবার আন্দোলনে যোগ দেন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ চলতি বছরের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’কে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকার সক্ষমতা। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় তরুণদের লড়াই ও অদম্য মানসিকতার প্রতীক।