ইসরায়েল–ইরান সংঘাত এখন এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ১৩ জুন শুরু হওয়া ইসরায়েলের ‘Operation Rising Lion’ অভিযানে ইরানের সামরিক স্থাপনা, মিসাইল ঘাঁটি এবং পারমাণবিক সুবিধাগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বোমাবর্ষণ চালানো হয়েছে। ইরান পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে ১৫০টির বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও শতাধিক ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহৃত হয়েছে। এই সংঘাতে ইরানে ৪০০ থেকে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং আহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে; ইসরায়েলও উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করেছে। ড্রোন ও গোপন মিশনের মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও Fordow ও Arak-এর মতো গভীর পারমাণবিক সুবিধাগুলো এখনও কার্যত সক্রিয় রয়ে গেছে।
দু:দু:খজনক হলো বিশ্ব সমাজ এই সংঘাতে বিভক্ত অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। যুক্তরাজ্য ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছে, যদিও যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের ডাক দিচ্ছে। জি-৭ দেশগুলো ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ইরানকে অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে তারা যুদ্ধ বিরতি এবং আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কূটনৈতিক সমাধানকেই একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে এবং আলোচনার মাধ্যমে পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান চাচ্ছে। রাশিয়া ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার সমর্থন করছে এবং চীন যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য শক্তিগুলো- যেমন সৌদি আরব ও ইরাক- সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
সম্ভাব্য পরিণতির দিক থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। যদি ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানের গভীর পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এতে পারমাণবিক স্থাপনার ক্ষতি এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হবে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। ইতিমধ্যে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি ও গণমানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষত জ্বালানি বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যদিও জি-৭ দেশগুলো তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
এই মুহূর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগই একমাত্র আশার আলো হিসেবে দেখা দিচ্ছে। জেনেভা ও অন্যান্য স্থানে জি-৭ এবং ইউরোপীয় নেতারা ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইরানও শর্তসাপেক্ষে পারমাণবিক সমঝোতায় ফিরতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তবে তা যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভর করছে। আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে, তাই নির্ধারণ করবে সংঘাত থামবে, নাকি এটি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
ইসরায়েল-ইরান সংঘাত এখন এমন এক মোড়ে পৌঁছেছে যেখানে সামরিক অভিযান আর কূটনৈতিক প্রয়াস মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিশ্ব সমাজের অবস্থান স্পষ্টত বিভক্ত- কেউ সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে, কেউ কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। কিন্তু প্রতিদিন যে ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধের উত্তাপ কমাতে এবং সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে এখনই কার্যকর ও আন্তরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সময়ের দাবি।