এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ইরান সংঘাত: ট্রাম্পের সম্ভাব্য অভিযান ও নেপথ্য সমীকরণ

ইরান সংঘাত: ট্রাম্পের সম্ভাব্য অভিযান ও নেপথ্য সমীকরণ

আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এক আগ্নেয়গিরির নাম, যার প্রতিটি অগ্নুৎপাতে কেঁপে ওঠে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্তম্ভ। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুংকার এবং তেহরানের পাল্টা প্রস্তুতির খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ড্রপ সাইট নিউজের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন যে, চলতি সপ্তাহান্তেই ইরান অভিমুখে উড়তে পারে মার্কিন যুদ্ধবিমান। এই সংবাদের সত্যতা এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো হামলার লক্ষ্যবস্তু। সাধারণত কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে পারমাণবিক স্থাপনা বা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করার যুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন, তিনি দাবি করেছেন যে এই সম্ভাব্য হামলার মূল লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সমরাস্ত্র ধ্বংস করা নয়, বরং ইরানের শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র নেতৃত্বকে যদি শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা যায় বা তাদের সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া যায়, তবে দেশটিতে বিদ্যমান সরকারের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে পড়বে। এই পরিকল্পনাকে তারা প্রতীকীভাবে শিরশ্ছেদ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা এই উত্তেজনায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। দীর্ঘকাল ধরেই নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে আসছেন। ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার পর নেতানিয়াহু আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছেন যে ইরানে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েল সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। তাদের বিশ্বাস, বর্তমান শাসনকাঠামো ভেঙে পড়লে এমন এক নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসবে যারা পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি বন্ধুসুলভ হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠায় বাধা দেবে না। এই পরিকল্পনা মূলত ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এক যৌথ কৌশলগত ছক, যেখানে ইরানকে কেন্দ্র করেই আগামীর বিশ্বব্যবস্থা সাজাতে চান তারা।

বিশ্লেষক পর্যায়ে আলোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য হামলা কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক জুয়া। ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর সফল আঘাত হানা সম্ভব হলে দেশটির সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসবে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে থাকা ইরানিরা হয়তো এই সুযোগে বিদ্যমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। তবে এই তত্ত্ব কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইরাক বা লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা ও চরমপন্থার উত্থান ঘটিয়েছে। ইরানের মতো একটি বিশাল আয়তন ও শক্তিশালী সামরিক ঐতিহ্যের দেশে এ ধরনের পরিকল্পনা বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাতকে তারা সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে গণ্য করবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও আইআরজিসি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে ঘিরে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত মজুত। তেহরানের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এবং ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দাউদাউ করে জ্বলবে। এই পাল্টা হুমকির কারণে গোটা অঞ্চল এখন এক থমথমে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সামান্য একটি আগুনের ফুলকি পুরো বিশ্বকে জ্বালিয়ে দিতে পারে।

দুইজন সিনিয়র আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, হামলার ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে। রোববার বা ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই এই অভিযানের সূচনা হতে পারে বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক তেল বাজার ও শেয়ার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ ইরান যদি পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো এই পরিস্থিতির দিকে গভীর উদ্বেগের সাথে তাকিয়ে আছে। কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো এখনো শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়, কিন্তু হোয়াইট হাউসের কঠোর অবস্থান সেই আশায় জল ঢেলে দিচ্ছে।

সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যদি সত্যি হয়, তবে তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। কোনো সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং সামরিক শক্তিতে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা বিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিচয় দেয়। তাছাড়া, ইরানে সরকার পরিবর্তন হলেই যে সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বরং আইআরজিসি-র মতো একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যদি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, তবে সেই শূন্যস্থানে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটতে পারে। ইসরায়েল হয়তো সাময়িক স্বস্তি পাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক অন্তহীন সংঘাতের কবলে পড়বে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ড্রপ সাইট নিউজের এই প্রতিবেদন কেবল একটি আগাম সতর্কবার্তা নয়, এটি বর্তমান বিশ্বের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে ১ ফেব্রুয়ারি তারিখটি ইতিহাসের পাতায় এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করবে, নাকি এই সম্ভাব্য প্রলয় রুখতে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে। যুদ্ধের দামামা বাজছে ঠিকই, কিন্তু শান্তির পথ এখনো পুরোপুরি রুদ্ধ হয়নি। যদিও ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সেই পথকে প্রতিদিন আরও সরু করে দিচ্ছে।