মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে যখন ইরানি ও মার্কিন সেনাদের রক্তে বালু লাল হচ্ছে, তখন প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে ওয়াশিংটনের করিডোরে বাজছে বিপদের ঘণ্টা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ ‘ইরান অভিযান’ নিয়ে খোদ মার্কিন জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। সাম্প্রতিক এক রয়টার্স-ইপসোস (Reuters-Ipsos) জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র চারজন আমেরিকানের মধ্যে একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। বিশেষ করে মার্কিন সেনাদের মৃত্যু এবং ক্রমবর্ধমান তেলের দামের আশঙ্কায় ট্রাম্পের নিজের শক্ত ঘাঁটি বা ‘মাগা’ (MAGA) সমর্থকদের মধ্যেও ফাটল দেখা দিয়েছে।
জরিপের ফলাফল: ট্রাম্পের জন্য এক অশনি সংকেত
শনিবার ও রবিবার পরিচালিত এই জরিপে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। যখন হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষণা করা হলো যে, ইরানের পাল্টা হামলায় প্রথম তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, ঠিক তার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সাধারণ মার্কিনিদের মনোভাব ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক।
সার্বিক অনুমোদন: মাত্র ২৫% উত্তরদাতা এই সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেছেন।
অসন্তোষের মাত্রা: ৪৩% মার্কিনি সরাসরি এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, আর ২৯% এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।
দলীয় বিভাজন: ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৭৪% এই হামলার বিপক্ষে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো রিপাবলিকানদের জন্য। যদিও ৫৫% রিপাবলিকান হামলা সমর্থন করেছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে ৪২% জানিয়েছেন যে, যদি আরও মার্কিন সেনা নিহত হয় বা আহত হয়, তবে তারা এই সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবেন।
ট্রাম্পের ‘রাইটাস মিশন’ বনাম জনরোষ
এত নেতিবাচক জনমত সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছু হটতে নারাজ। রবিবার এক বিবৃতিতে তিনি এই অভিযানকে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত মিশন’ (Righteous Mission) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুকে উদযাপন করে ট্রাম্প দাবি করেন, "ইরানের শাসকরা সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।" তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে এবং আরও মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন ‘এন্ডলেস ওয়ার’ বা অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এখন তিনি নিজেই একটি বিশাল আঞ্চলিক যুদ্ধের কারিগর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
তেলের দাম ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের ছায়া
মার্কিন ভোটারদের কাছে যুদ্ধ কেবল আদর্শিক বিষয় নয়, এটি সরাসরি পকেটে টান দেয়। জরিপে দেখা গেছে, ৪৫% উত্তরদাতা (যার মধ্যে ৩৪% রিপাবলিকান) জানিয়েছেন যে, যদি এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, তবে তারা কোনোভাবেই এই সামরিক অভিযান সমর্থন করবেন না। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বাণিজ্যিক রুটগুলোতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে।
মিডটার্ম নির্বাচন ও ডেমোক্র্যাটদের রণকৌশল
সামনেই মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Election)। এই জনমত জরিপ ডেমোক্র্যাটদের হাতে এক শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তারা এখন ট্রাম্পের এই অভিযানকে ‘ব্যক্তিগত যুদ্ধ’ বা ‘ট্রাম্পের পছন্দসই যুদ্ধ’ (War of Choice) হিসেবে চিহ্নিত করছে।
সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এক্সে (X) লিখেছেন, "ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি আমাদের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু আজ আমরা আমাদের সাহসী সেনাদের হারাচ্ছি। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ।" ডেমোক্র্যাটরা এখন একটি ‘ওয়ার পাওয়ার রেসোলিউশন’ (War Powers Resolution) পাসের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, যা প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতাকে সীমিত করবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই এর ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষণ: কেন এই জনমত ধস?
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডগ ব্যান্ডো (Doug Bandow) আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমেরিকানরা দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে থাকতে চায় না। যখনই কফিনগুলো দেশে ফিরতে শুরু করে, তখনই তারা বুঝতে পারে এটি কোনো ভিডিও গেম নয়। এটি এক ভয়াবহ বাস্তবতা।"
এখন পর্যন্ত প্রাণহানির পরিসংখ্যান (আনুমানিক):
ইরান: ২০১ জন (বেসামরিক ও সামরিক)
ইসরায়েল: ৯ জন
মার্কিন সেনা: ৪ জন (পাল্টা হামলায়)
ইরাক ও কুয়েত: ৩ জন
ভূ-রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক নাকি কৌশলগত ভুল?
ইরানের বিরুদ্ধে এই প্রলয়ঙ্কারী অভিযানের পেছনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফর এবং ওমানের চাবাহার বন্দরে গোয়েন্দা নজরদারির যে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। যদি ট্রাম্পের নিজের দেশেই জনসমর্থন না থাকে, তবে দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ চালানো মার্কিন অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। লারিজানি ও আরাগচির দেওয়া ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ এবং দীর্ঘ যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
কোন দিকে যাচ্ছে আমেরিকা?
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এখন ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে যে অভিযোগ লারিজানি তুলেছেন, তা ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বা কোনো চূড়ান্ত জয় না আসে, তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় যে ধস শুরু হয়েছে, তা তাকে ২০২৮ সালের নির্বাচনী দৌড় থেকেও ছিটকে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বালুকারাশি কেবল ইরানের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, এটি এখন ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের গদিও কাঁপিয়ে দিচ্ছে।