এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৭ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ইরান ইস্যুতে কোন পথে ট্রাম্প

ইরান ইস্যুতে কোন পথে ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও একটি কঠিন কৌশলগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক চাপ বাড়ানো কিংবা আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়া, উভয় পথই তাঁর জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, ট্রাম্পের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘পেনরোজ স্টেয়ার্স’ নামের অপটিক্যাল ইলিউশনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই বিভ্রমে মনে হয় মানুষ ক্রমাগত ওপরে উঠছে বা নিচে নামছে, অথচ শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় ফিরে আসে। ইরান ইস্যুতেও ট্রাম্প যেন এমন এক চক্রে আটকে গেছেন, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাঁকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো সুস্পষ্ট প্রস্থান কৌশল ছাড়া সামরিক অভিযান শুরু করা। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে পারেনি।

গত বুধবার হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় এবং ট্রাম্পের সামনে আবারও দুটি পথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করা, অন্যদিকে ভঙ্গুর হয়ে পড়া সমঝোতাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ট্রাম্প ওই সমঝোতাকে তাঁর অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক সফরের সময় ট্রাম্প বলেন, সমঝোতা স্মারকটি "কার্যত শেষ" হয়ে গেছে এবং ইরানকে "উন্মাদ" বলে মন্তব্য করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি। তাঁর ভাষায়, প্রয়োজনে মার্কিন আলোচকেরা আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন এবং চুক্তি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প চাইলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। যদিও পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযানকে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসামরিক অবকাঠামো কিংবা হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় এলাকায় হামলার মতো বিকল্প বিবেচনায় থাকতে পারে।

আরেকটি আলোচিত সম্ভাবনা হলো ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করা। তবে এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির আশঙ্কা যেমন বাড়বে, তেমনি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন। প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ইরানকে সম্পূর্ণভাবে সামরিক শক্তি দিয়ে পরাজিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কূটনৈতিক পথকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প চাইলে আবারও ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারেন। ইতোমধ্যে এমওইউর আওতায় শিথিল করা তেল নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিয়ে সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার পথও খোলা রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে পরিণত হতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে ইরান সংকটে ট্রাম্পের সামনে এখন এমন এক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত, যেখানে প্রতিটি পথই বড় ধরনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি বহন করছে। তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।