মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় ধরনের সামরিক হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই বক্তব্যের পর অঞ্চলজুড়ে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত খুবই নিকটবর্তী। তিনি দাবি করেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবেই অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। পাশাপাশি ইসরায়েলও খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমন কোনো অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো বিমান হামলার খবর প্রকাশিত হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, রাজধানী তেহরানসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীসংলগ্ন কিসম ও বান্দর আব্বাস এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, একটি সংকট আরেকটি সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য ইরান থেকে তাদের কূটনৈতিক কর্মীদের সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মানি লোহিত সাগর থেকে তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণ ও ফ্লাইট সংক্রান্ত সতর্কবার্তা জারি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর হামলায় দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের ধারণা, হরমুজ প্রণালীতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব যে বিকল্প রুট ব্যবহার করে এশিয়ার বাজারে তেল সরবরাহ করছে, সেটিকে লক্ষ্য করেই হুতিদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইয়েমেনে ইরানের সামরিক সহায়তা ও সরঞ্জাম পাঠানোর তথ্যও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বিষয়েও নতুন শর্তের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের সহযোগিতা পেতে হলে সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া এ বিষয়ে কোনো সমঝোতায় যাবে না বলে আগেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে রিয়াদ।
সব মিলিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ, আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান এবং তেলবাহী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর নিরাপত্তা সংকট মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে বৃহৎ আকারের সংঘাতের ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পরিস্থিতির পরবর্তী মোড়ের দিকে গভীর নজর রাখছে।