তুরস্ক ও ইরাকের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে। উত্তর ইরাকের কিরকুক তেলক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব অর্জনের মাধ্যমে তুরস্ক শিগগিরই ইরাক থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ লাখ ব্যারেল তেল পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত তুর্কি পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিওএ) একটি পৃথক শেয়ার হস্তান্তর চুক্তির আওতায় উত্তর ইরাকের কিরকুক তেলক্ষেত্র পরিচালনাকারী বিপি এনার্জি কোম্পানি অব কিরকুক লিমিটেডের ১৫ শতাংশ মালিকানা কিনতে যাচ্ছে।
এরদোয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিনিয়োগের ফলে ইরাক থেকে তুরস্কে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহের পথ আরও সুগম হবে। তিনি বলেন, "আমাদের প্রতিবেশী ইরাক থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ শুরু হলে তা আমাদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদির সাম্প্রতিক তুরস্ক সফরে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পরিবহন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি খাতে নতুন সহযোগিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এই সফরটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন ১৯৭৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরাক-তুরস্ক অপরিশোধিত তেল পরিবহন চুক্তির মেয়াদ গত ২৭ জুলাই শেষ হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ওই চুক্তির আওতায় কিরকুক-জেইহান পাইপলাইনের মাধ্যমে ইরাকের তেল তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেইহানে পৌঁছাত। তবে পুরোনো চুক্তি নবায়নের পরিবর্তে তুরস্ক এখন ইরাকের সঙ্গে নতুন জ্বালানি সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহী।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহর সম্পাদকীয় সমন্বয়কারী মেহমেত চেলিকের মতে, নতুন এই চুক্তি কেবল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নয়, বরং এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পও জড়িত। তিনি বলেন, তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার নীতি অনুসরণ করছে এবং ইরাকের সঙ্গে এই সহযোগিতা সেই কৌশলেরই অংশ।
তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতা বিকল্প জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তুরস্কের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক জ্বালানি ও পরিবহন উদ্যোগগুলো এখন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর ইরাকের কাছে তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকা ইরাক-তুরস্ক তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে আবারও তেল রপ্তানি শুরু করার জন্য বাগদাদ আঙ্কারার সঙ্গে আলোচনা জোরদার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে তুরস্ক ও ইরাকের সম্পর্ক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হলো নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন। এই তিন খাতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো নিরাপত্তা। বিশেষ করে উত্তর ইরাকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-বিরোধী অভিযানে তুর্কি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ইরাকের এরবিল, দোহুক ও নিনেভেহ অঞ্চলে তুরস্কের প্রায় ৫০টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫ হাজার তুর্কি সেনা মোতায়েন রয়েছে।
যদিও ২০২৫ সালে পিকেকে তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকের সংঘাতের অবসানে নিরস্ত্রীকরণের ঘোষণা দেয়, তবুও উত্তর ইরাকে সংগঠনটির উপস্থিতিকে তুরস্ক এখনো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ান বলেন, "সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক এবং সন্ত্রাসমুক্ত একটি অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা আমাদের ইরাকি ভাইদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংলাপ অব্যাহত রেখেছি।"
নতুন এই জ্বালানি অংশীদারত্ব শুধু তুরস্কের জ্বালানি নিরাপত্তাই জোরদার করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্ক-ইরাক সম্পর্ককে আরও কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যাবে।