ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৪ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

আসন্ন নির্বাচন: ৯ আসনে নেই ধানের শীষ ও বিএনপির নতুন সমীকরণ

আসন্ন নির্বাচন: ৯ আসনে নেই ধানের শীষ ও বিএনপির নতুন সমীকরণ

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক আঙিনায় বইছে উত্তাল হাওয়া। দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তনের পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অপেক্ষায় যখন দেশবাসী, তখন ৩০০ আসনের প্রার্থী তালিকা এবং জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে দলগুলোর ভেতর তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। বিশেষ করে বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত বিএনপির নির্বাচনি কৌশল এবার অনেকটা ভিন্নতর। বিগত কয়েক বছরের রাজনৈতিক শূন্যতা কাটিয়ে এবার যখন সব দল নির্বাচনের মাঠে সক্রিয়, তখন ৩০০ আসনের সবগুলোতে তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক ধানের শীষ না থাকার বিষয়টি এক বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক কৌশল ও আইনি জটিলতার কারণে অন্তত ৮ থেকে ৯টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীহীনতা তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে জোটবদ্ধ রাজনীতির বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে আদালতের রায়ে প্রার্থিতা বাতিলের ধাক্কা—সব মিলিয়ে এই আসনগুলোর নির্বাচনি ভবিষ্যৎ এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।

তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের একটি বড় অংশ ছিল এবার জোটের শরিকদের আস্থায় রাখা। বিগত দিনের বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে যারা রাজপথের সঙ্গী ছিল, তাদের জন্য ১১টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তবে এই ১১টি আসনের বিন্যাসে রয়েছে বৈচিত্র্য। এর মধ্যে ৭টি আসনে জোটের শরিকরা তাদের নিজ নিজ দলীয় প্রতীকেই লড়ছেন। এখানে একটি রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট যে, শরিকরা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা টিকিয়ে রেখেই নির্বাচনি সমঝোতায় পৌঁছেছে। বাকি ৪টি আসনে কৌশলটি ছিল ভিন্ন; সেখানে অন্য দল থেকে আসা প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক গ্রহণ করেছেন। এই ৪ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, অন্য ৭টি আসনে ধানের শীষের অনুপস্থিতি ওই এলাকার সাধারণ কর্মীদের জন্য মানসিকভাবে কিছুটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে আইনি জটিলতা দলটির জন্য বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ঋণখেলাপের দায়ে কুমিল্লা-৪ আসনে মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র আদালত কর্তৃক চূড়ান্তভাবে বাতিল হওয়া একটি বড় ধাক্কা। একজন প্রভাবশালী প্রার্থীর অনুপস্থিতি মানেই হলো সেই আসনে ধানের শীষ প্রতীকের লড়াই থেকে ছিটকে পড়া। একই ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম-২ বা ফটিকছড়ি আসনে। সেখানে মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ফেরতের বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিলের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থিতা ফিরে না আসে, তবে ধানের শীষ বিহীন আসনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৯-এ। চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদে ধানের শীষ না থাকা মানে হলো প্রতিপক্ষের জন্য মাঠ অনেকটা উন্মুক্ত করে দেওয়া, যা দলীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলামী ধারার দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। দলটি ৪টি আসন পেয়েছে। সিলেট-৫ আসনে দলটির সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, নীলফামারী-১ আসনে মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আলেম সমাজ ও তাদের অনুসারীদের ভোট ব্যাংক নির্বাচনি ফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রগতিশীল ধারার নেতাদের মধ্যেও আসন ভাগাভাগি হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর নিজ নিজ দলের প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন। এসব এলাকায় বিএনপির সমর্থকরা ধানের শীষ না পেয়ে তাদের জোটসঙ্গী বা পছন্দের প্রতীকে ভোট দেবেন কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।

নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে এবার অনেক প্রভাবশালী নেতাকে নিজ দল ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিতে দেখা গেছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি গণমানুষের আবেগ ও ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. রেদোয়ান আহমেদ কুমিল্লা-৭ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক পেতে নিজের দীর্ঘদিনের দল ছেড়েছেন। একইভাবে এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ এবং এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। এমনকি গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খানও বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন। এই দলবদল এবং প্রতীকের প্রতি মোহ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় চিহ্নের প্রভাব এখনো কতটা সুগভীর।

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির এই কৌশলটি দ্বিমুখী। একদিকে তারা জোটের নেতাদের সুযোগ দিয়ে বৃহত্তর ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী নেতাদের ধানের শীষ প্রতীকের নিচে নিয়ে এসে জয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। তবে যে আসনগুলোতে ধানের শীষ থাকবে না, সেখানে সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি কেমন হবে এবং তারা জোটের প্রতীকে কতটা উদ্বুদ্ধ হবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। বিশেষ করে যেসব আসনে আইনি কারণে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক শেষ পর্যন্ত কার বাক্সে যাবে, তা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল প্রার্থীর অনুপস্থিতিতে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান, যা শেষ পর্যন্ত দলীয় ম্যান্ডেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এই ৯টি আসনের পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। ধানের শীষের অনুপস্থিতিতে জোটের শরিকরা কতটা সফল হন এবং অন্য দল থেকে আসা প্রার্থীরা তৃণমূলের সমর্থন কতটা আদায় করতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ত্রয়োদশ সংসদের শক্তিমত্তা। কুমিল্লার ঋণখেলাপের ঘটনা এবং চট্টগ্রামের আইনি লড়াই শিক্ষা দিচ্ছে যে, আগামীতে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আইনি বিষয়গুলো আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে প্রতীক থাকুক বা না থাকুক, নির্বাচনি মাঠের এই ওলটপালট বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন ও চ্যালেঞ্জিং বাস্তবতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরছে।