মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন এএফএল-সিআইও (AFL-CIO) মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টের গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেটি নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারী এই সংগঠনটি প্রেটির মৃত্যুকে একটি ‘অর্থহীন হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে। একই সাথে তারা মিনসোটা স্টেট থেকে অবিলম্বে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইস কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, গত কয়েকদিন ধরে হাজার হাজার মিনসোটাবাসী শান্তিপূর্ণভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ভয়াবহ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ মূলত সহিংসতা এবং বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়ার একটি অপপ্রয়াস। এএফএল-সিআইও দাবি করেছে যে, মিনসোটাতে আর কোনো প্রাণহানি ঘটার আগেই আইস-কে এই স্টেট ছাড়তে হবে। তারা এই ঘটনার একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কংগ্রেসের মাধ্যমে আইস-এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছে।
নিহত অ্যালেক্স প্রেটি ছিলেন একজন মার্কিন নাগরিক এবং তিনি ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স হাসপাতালে আইসিইউ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শনিবার মিনিয়াপোলিস পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনার সময় প্রেটি ফেডারেল এজেন্টদের কার্যক্রম ভিডিও করছিলেন। ঠিক তখনই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং একজন এজেন্ট তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। যদিও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করেছে যে প্রেটির কাছে একটি ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ছিল এবং তিনি কর্মকর্তাদের বাধা দিয়েছিলেন, কিন্তু ঘটনার একাধিক ভিডিও ফুটেজ সেই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, গুলি করার আগেই প্রেটিকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল এবং তিনি কোনোভাবেই এজেন্টদের জন্য হুমকি ছিলেন না। স্থানীয় পুলিশ আরও জানিয়েছে যে, প্রেটির কাছে ওই অস্ত্র বহন করার বৈধ অনুমতি ছিল।
প্রশাসন এই অভিযানকে অপারেশন মেট্রো সার্জ হিসেবে অভিহিত করেছে, যার লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কার করা। ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এই অভিযানে ইতিমধ্যে মিনসোটা স্টেট জুড়ে প্রায় ২,০০০ ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা এই অভিযানের কৌশল নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। গত ৭ জানুয়ারি আইস এজেন্টের গুলিতে রিনি গুড নামে আরেক মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, মিনসোটা স্টেটের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন—টার্গেট, কারগিল এবং ইউনাইটেড হেলথ-এর প্রধান নির্বাহীরা যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন।
এএফএল-সিআইও-এর মিনসোটা স্টেটের প্রেসিডেন্ট বার্নি বার্নহাম বলেন, অপারেশন মেট্রো সার্জ কখনোই অভিবাসন আইন প্রয়োগের জন্য ছিল না। এটি মূলত এমন একজন প্রেসিডেন্টের প্রতিহিংসা, যিনি তার নীতির বিরোধিতা করায় মিনসোটাবাসীর ওপর ফেডারেল সরকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, আমেরিকান ফেডারেশন অফ গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ, যারা প্রেটির মতো ফেডারেল কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব করে, তারাও এই দুঃখজনক ঘটনার জন্য প্রশাসনের হঠকারী নীতি ও উসকানিমূলক বক্তব্যকে দায়ী করেছে। সংগঠনের জাতীয় সভাপতি এভারেট কেলি বলেন, ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতি সমাজে ভয় ও বিভাজন তৈরি করেছে। তিনি জনগণকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানালেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা চুপ থাকবেন না এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন।
বিশ্লেষকদের অভিমত:
অ্যালেক্স প্রেটির হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যকার সংঘাতের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। একজন কর্তব্যরত নার্স এবং মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ফেডারেল এজেন্টদের হাতে তার মৃত্যু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। ভিডিও প্রমাণ এবং প্রশাসনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যকার অমিল ইঙ্গিত দেয় যে, অপারেশন মেট্রো সার্জ এর আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটছে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং বড় বড় কর্পোরেট হাউসের উদ্বেগ প্রমাণ করে যে, এই সংকট এখন আর কেবল রাজনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। মিনসোটা স্টেটের এই অস্থিরতা আগামী দিনে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধাকারীদের মহলে বড় ধরনের পরিবর্তনের চাপ তৈরি করবে।