যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনার জন্ম দিয়েছে নিউ জার্সির ফেডারেল আদালত। আদালত অবমাননা, মিথ্যাচার এবং বিচারবিভাগের আদেশ অমান্য করার দায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন ফেডারেল বিচারক জাহিদ এন. কুরাইশি। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক কঠোর রায়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, নিউ জার্সির ইউএস অ্যাটর্নি অফিস তাদের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে’ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসন সংক্রান্ত আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করছে।
আদালতের ‘অসহায়ত্ব’ ও কঠোর হুঁশিয়ারি
বিচারক কুরাইশি, যিনি নিজে একজন প্রাক্তন ফেডারেল প্রসিকিউটর এবং বাইডেন প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির প্রয়োগকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন যদি এমন আইনি ভিত্তিহীন অজুহাতে অভিবাসীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত রাখে যা আদালত ইতিমধ্যেই নাকচ করে দিয়েছে, তবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শপথ গ্রহণ করে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সেই গ্রেপ্তারের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।”
এই ধরনের কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণের অর্থ হলো, সরকার এখন থেকে প্রতিটি গ্রেপ্তারের বিষয়ে আদালতের কাছে চরম সন্দেহের মুখোমুখি হবে। বিচারক কুরাইশি ক্ষোভের সাথে লিখেছেন, “এই ডিস্ট্রিক্টের আদালতের পক্ষ থেকে বন্দীদের অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টা সরকারের দ্বারা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, ইউএস অ্যাটর্নি অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে তারা আদালতের ৭০টিরও বেশি আদেশ লঙ্ঘন করেছেন। বিচারক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমি এখন আর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে এই ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ চলতে দেব না। এর অবসান আজই হবে।”
বাফেলো ট্র্যাজেডি ও ডাইনা কার্তাহেনা হুয়েসোর মামলা
বিচারক কুরাইশির এই রায় এমন একটি সময়ে এলো যখন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন প্রয়োগে ‘সন্ত্রাস’ ও ‘অমানবিকতা’র অভিযোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রায়ে যে মামলার উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো ২৯ বছর বয়সী এল সালভাদরের নাগরিক ডাইনা কার্তাহেনা হুয়েসো। তিনি ২০১৬ সালের আগস্টে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং পরে আশ্রয় (Asylum) পাওয়ার যোগ্য হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন। গত এক দশক ধরে তিনি আইনগতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন এবং তার ৫ বছর বয়সী আমেরিকান নাগরিক সন্তান রয়েছে।
গত ২৭ জানুয়ারি হুয়েসো এবং তার স্বামীকে ডাক্তার দেখানোর জন্য যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তির জন্য পিটিশন দাখিল করলে, বিচারক কুরাইশি আদেশ দেন যে সরকার যেন হুয়েসোকে নিউ জার্সি থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তর না করে এবং একটি বন্ড শুনানির ব্যবস্থা করে। কিন্তু ততক্ষণে সরকার হুয়েসোকে ওকলাহোমায় স্থানান্তর করে ফেলেছিল এবং পরে তাকে টেক্সাসেও নেওয়া হয়। বিচারক ক্ষোভের সাথে জানান, সরকার এই স্থানান্তরগুলো সম্পর্কে আদালতকে কিছুই জানায়নি এবং কেন তাকে দু’দিনে তিনবার স্থানান্তর করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি।
আইনি ত্রুটি ও সরকারের ‘জালিয়াতি’
সরকার হুয়েসোর গ্রেপ্তারের বৈধতা হিসেবে এমন একটি আইন ব্যবহার করেছে যা অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত ডিপোর্ট বা দেশান্তরি করার সুযোগ দেয়। কিন্তু নিউ জার্সির ফেডারেল আপিল আদালত আগেই স্পষ্ট করেছে যে, এই আইনটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা মাত্র ১৪ দিন আগে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন এবং সীমান্তের ১০০ মাইলের মধ্যে ধরা পড়েছেন।
বিচারক কুরাইশি তার রায়ে লিখেছেন যে, তিনি আগেও সরকারের এই ত্রুটিপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যা থেকে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এখন আর তা করবেন না। তিনি হুয়েসোর অবিলম্বে মুক্তির আদেশ দেন। বিচারক উল্লেখ করেন যে, এটি কেবল হুয়েসোর মামলা নয়, বরং এই রাজ্যে সরকারের অভিবাসন প্রয়োগের একটি ‘প্রতীকী রূপ’। তিনি বলেন, “আইনত এই গ্রেপ্তারগুলো অবৈধ, এবং সরকার তা খুব ভালো করেই জানে।”
সাংবিধানিক সংকট ও বিচারবিভাগের প্রতিরোধ
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়টি কেবল ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি মার্কিন গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার একটি লড়াই। এখানে তিনটি বিষয় বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি:
১. বিচারবিভাগের অবজ্ঞা ও আইনের শাসন:
বিচারক কুরাইশি যখন বলেন যে সরকার ৭০টিরও বেশি আদেশ লঙ্ঘন করেছে, তখন তা আইনের শাসনের ওপর নগ্ন আঘাতের ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আদালত যে আদেশ দেয় তা চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। সরকার যখন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই আদেশ অমান্য করে, তখন এটি পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে একটি ‘ম্যাট ল’ (Martial Law) বা স্বৈরাচারী শাসনের দিকে নিয়ে যায়।
২. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলাতন্ত্র বনাম বিচারক:
বিচারক কুরাইশি বাইডেন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও, তিনি প্রাক্তন ডিএইচএস (DHS) আইনজীবী ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত। এই সংঘর্ষ প্রমাণ করে যে, আমলাতন্ত্র কীভাবে আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডাকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
৩. ‘অভিবাসন সন্ত্রাস’ ও জননিরাপত্তা:
ক্যালিফোর্নিয়ার বিচারক সানশাইন সাইকস যেমন প্রশাসনের কার্যক্রমকে ‘সন্ত্রাস ক্যাম্পেইন’ বলেছেন, বিচারক কুরাইশির রায় তা সমর্থন করে। যখন একজন পরিবার নিয়ে ১০ বছর ধরে বসবাসকারী মা গ্রেপ্তার হন, তখন তা সমাজের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। জননিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যে আইনি জালিয়াতি করা হচ্ছে, তা খোদ মার্কিন সংবিধানের মূলনীতি—‘সবার জন্য সমান বিচার’—এর পরিপন্থী।
বিচারক কুরাইশির এই কঠোর অবস্থান মার্কিন বিচারবিভাগের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। তবে এই লড়াই কেবল আদালতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা এমন একটি প্রশাসন চান কি না যা নিজস্ব আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে।