বাংলাদেশে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একইসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারসংক্রান্ত গণভোট। দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন, স্বৈরতান্ত্রিক অভিযোগ, গণআন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতার পর এই নির্বাচনকে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের ভোট নয়, রাষ্ট্রের কাঠামো, শাসনব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর এই ভোটের প্রভাব পড়বে বলেই দেশ-বিদেশের নজর আজ ঢাকার দিকে।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে সংকট ঘনীভূত হয়েছিল নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা, বিরোধী রাজনীতির সংকোচন, মানবাধিকার প্রশ্ন, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ। সেগুলোই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয় ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে। সেই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠিত হয় এবং তারা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে। আজকের ভোট সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশের কোটি কোটি ভোটার আজ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। তরুণ ভোটারের সংখ্যা এবার সর্বোচ্চ। যাদের বড় অংশ প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন মূলত প্রজন্মগত একটি ভোট। পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো বনাম সংস্কারমুখী প্রত্যাশার ভোট।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায়ও সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। ঐতিহ্যগত প্রতিশ্রুতি। উন্নয়ন, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান—এর পাশাপাশি এবার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং দুর্নীতি দমন। গণভোটের প্রশ্নগুলোও মূলত এসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে ঘিরেই।
অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপে মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য শর্ত। তারা মনে করছেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে বিনিয়োগ আস্থা ফিরবে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সহজ হবে। অন্যদিকে একটি বিতর্কিত নির্বাচন দেশের অর্থনীতি ও কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহলও এবারের নির্বাচনের দিকে গভীর নজর রাখছে। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পর্যবেক্ষক উপস্থিত রয়েছেন। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতেও বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর আগ্রহও স্পষ্ট।
সামাজিক বাস্তবতাতেও এই ভোটের প্রভাব গভীর হতে পারে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এটি কেবল সরকার গঠনের নির্বাচন নয়, আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র নাগরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা ভোটকে দেখছে একটি রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া হিসেবে।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ফলাফল ঘোষণার স্বচ্ছতা এই তিনটি বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি শান্ত থাকবে কিনা। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ ভোটের আশ্বাস দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ভোটের দিন নয়, এটি রাষ্ট্রের বৈধতা পুনর্নির্মাণের দিন। গণভোটের ফল রাষ্ট্র সংস্কারের পথ নির্ধারণ করবে, আর সংসদ নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে সেই সংস্কার কার্যকর করার রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মাঠে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশের পাশাপাশি একাধিক সহায়ক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি সদস্যরা, আর কেন্দ্রের বাহিরের এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের সদস্যদের। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে, যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, সহিংসতা, ভোটার ভয়ভীতি বা কেন্দ্র দখলের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে আধা সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে সহায়তাকারী শক্তি হিসেবে স্ট্যান্ডবাই রাখার কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাওয়া ও ফিরে আসা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে নারী ভোটার ও প্রথমবারের তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে নিরাপত্তা দৃশ্যমান রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে টহল, চেকপোস্ট এবং অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
অতএব, আজকের ব্যালট কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ব্যালট।
বাংলাদেশ কি পুরোনো দ্বন্দ্বের রাজনীতিতে ফিরে যাবে, নাকি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রে প্রবেশ করবে—তার উত্তর নির্ভর করছে আজকের ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর।
আজকের ভোট তাই একটি নির্বাচন নয়, এক অর্থে একটি গণঅভিমত বাংলাদেশ কোন পথে যাবে তার গণরায়।