বছর এখনও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে ২০২৫ সালকে অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন “আগুনের বছর”। জানুয়ারিতে টেকনাফ-কক্সবাজার উপকূল, মার্চে গুলশান-বাড্ডা, জুলাইয়ে স্কুলভবন, অক্টোবরে মিরপুরের গার্মেন্টস ও বিমানবন্দর কার্গো কমপ্লেক্স। সব মিলিয়ে ছোট বড় হাজারো অগ্নিকাণ্ডের ভয়াল ধারাবাহিকতার সর্বশেষ কিস্তি এখন রাজধানী ঢাকার কড়াইল বস্তি।
সোমবার বিকেলে কড়াইলে লাগা আগুনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুড়ে গেছে শত শত ঘর। হাজারো মানুষ দাঁড়ালেন খোলা আকাশের নিচে। বছরজুড়ে জমে থাকা শঙ্কার কাছে এই অগ্নিকাণ্ড যেন শেষ সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের নগরায়ণ, বস্তি ও শিল্পাঞ্চল কতটা অগ্নি ঝুঁকিতে বাস করছে, আবারও তা স্পষ্ট হলো।
বছরের শুরুতেই ‘হ্যাজার্ড’ হিসেবে আগুনকে আলাদা করে চিহ্নিত করা শুরু হয় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাসিক রিপোর্টে। জানুয়ারিতে কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলে এক অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৪ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, তিন শতাধিক ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। একই মাসে চট্টগ্রাম শহরের মধ্যেই একাধিক অগ্নিকাণ্ডে ঘরবাড়ি ও দোকান পুড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট ব্যবসা।
ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের একটি বাড়িতে আগুনে কয়েকজনের প্রাণহানি, ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় আগুনে একসাথে একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। সব মিলিয়ে আগুনের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে আগুনে পর্যটন রিসোর্ট এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাহাড়ি অঞ্চলেও নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলেছে।
মার্চে এসে আগুন যেন পুরোপুরি “জাতীয় দুর্যোগ”–এর চরিত্র পায়। বাড্ডায় একটি অগ্নিকাণ্ডে এক পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ কমপক্ষে ৩ জনের মৃত্যু হয়। দিনাজপুর, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী প্রায় প্রতিটি সপ্তাহেই নতুন কোনো স্থানে আগুনের খবর এসেছে। ১১ মার্চ গুলশানে লাগা এক আগুনে একসাথে প্রায় শতাধিক ঘর ও কয়েক ডজন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাজধানীর উচ্চ ঘনত্বের আবাসিক বাণিজ্যিক এলাকার অগ্নি ঝুঁকি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
এপ্রিল থেকে জুন এ সময়টায় বড় কোনো একক ট্র্যাজেডি তুলনামূলক কম হলেও সারা দেশে ছোট বড় আগুনের সংখ্যা কমেনি। শহর ও জেলার হাট বাজারের অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হয়েছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
এরপর জুলাইয়ে ভয়াবহ এক স্কুলে অগ্নিকাণ্ডে কয়েক ডজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মৃত্যু দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা প্রশ্নকে সামনে টেনে আনে। এক দিনের আগুনের ধ্বংসই দেখিয়ে দেয়, ইমারত নকশায় অনিয়ম, জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ, ফায়ার–সেফটি প্লান না থাকা কতটা প্রলয় ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা তখন থেকেই সতর্ক করে আসছেন, কোনো সেক্টরকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বস্তি, বিদ্যাপীঠ, কারখানা, গুদাম, বিমানবন্দর সবখানেই অগ্নি নিরাপত্তা কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে।
অক্টোবরে সেই সতর্কবার্তার নির্মম প্রমাণ মিলল শিল্পাঞ্চল ও কৌশলগত অবকাঠামোয়। ১৪ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে একটি গার্মেন্টস কারখানা ও লাগোয়া কেমিক্যাল গুদামে লাগা আগুনে প্রাণ হারান অন্তত ১৬ জন। ভবনের ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকরা বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা যান, অনেকেই বের হওয়ার পথই খুঁজে পাননি। দমকল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কারখানা ও গুদামে কার্যকর ফায়ার সেফটি প্লান ছিল না। রাসায়নিক দ্রব্য মজুদের নিয়মও মানা হয়নি।
এর অল্পদিন পর চট্টগ্রাম ইপিজেডের কারখানা, নরসিংদীর অবৈধ সীসা কারখানা এবং ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে একের পর এক বড় আগুনে ধ্বংস হয় কোটি কোটি টাকার রফতানি পণ্য ও কাঁচামাল। আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাজারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও রফতানি খাতের ভাবমূর্তি নিয়েও ওঠে প্রশ্ন।
এই সমগ্র প্রেক্ষাপটের মধ্যে বছরের শেষ ভাগে এসে নতুন করে আলোচনায় কড়াইল বস্তি।
রাজধানী ঢাকার হৃদয়ে অবস্থিত এই অনানুষ্ঠানিক বসতি কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে প্রান্তিক মানুষের ঠাঁই হিসাবে। টিন বাঁশ কাঠের গায়ে গায়ে ঘর, সরু গলি, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো রাস্তা নেই, পর্যাপ্ত পানি উৎস ও ফায়ার হাইড্রেন্টের কোনো ব্যবস্থা নেই—এমন এক কাঠামোর ভেতরে আগুন লাগলে তা মুহূর্তেই কয়েকশ ঘরে ছড়িয়ে পড়া প্রায় অবধারিত।
সোমবার বিকাল পাঁচটার কিছু পরে কড়াইলে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সরু গলি ও যানজটের কারণে প্রথম ইউনিট এলাকাটিতে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। পরে ধাপে ধাপে প্রায় বিশটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। পানির ট্যাঙ্কার সরাসরি ভেতরে নেওয়া না যাওয়ায় লেক ও খাল থেকে পাইপ টেনে পানি আনতে হয়েছে। কোথাও কোথাও চাপ কমে যাওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হয়েছে বলেই কর্মকর্তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
রাত সাড়ে দশটার দিকে আগুন “নিয়ন্ত্রণে” এসেছে বলে জানানো হলেও, ততক্ষণে শত শত ঘর ভস্মীভূত; বহু পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে রাস্তায়, ফুটপাতে বা লেকের ধারে বাক্স বিছানা নিয়ে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছে। সঠিক সংখ্যা এখনো গুনে উঠতে না পারলেও ঘরহারা মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে বলে ধারণা।
বছরের শুরু থেকে কড়াইল পর্যন্ত বিস্তৃত এই অগ্নিচিত্র বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগুন এখন আর কেবল “দুর্ভাগ্যজনিত দুর্ঘটনা” নয়, বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল বিল্ডিং রেগুলেশন, ফায়ার কোড না–থাকা, দারিদ্র্য ও বস্তিবাসীর ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন এবং জলবায়ু উষ্ণতার সম্মিলিত ফল। আগুন লাগার পেছনে থাকে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, গ্যাস লিক, কিংবা অসাবধানতা। কিন্তু আগুন ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত হয় মূলত কাঠামোগত ব্যর্থতার কারণে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, তাদের হাতে পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা নেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও গুদাম বন্ধ করে দেওয়ার। কেবল সতর্কতামূলক নোটিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোকে “ফায়ার অ্যাক্সেস সিটি” হিসেবে পুনর্গঠিত না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে। বস্তি অঞ্চলের জন্য জরুরি ভিত্তিতে অগ্নি নিরাপদ আবাসন, ফায়ার ব্রেক, কমিউনিটি ফায়ার ড্রিল ও আগুন প্রতিরোধী উপকরণ ব্যবহারের ওপরও তারা জোর দিচ্ছেন।
২০২৫ সালের বাকি দিনগুলো এখনো সামনে। তবে এখন পর্যন্ত যে চিত্র, তাতে বছরটি বাংলাদেশের জন্য স্পষ্টতই “অগ্নি ঝুঁকির নির্মম প্রমাণপত্র” হয়ে উঠেছে। কড়াইলের কালো ধোঁয়া মিলিয়ে যাবে, পুড়ে যাওয়া টিন কাঠ সরিয়ে নতুন ঘরও উঠবে। কিন্তু আগুনের প্রকৃত শিক্ষা যদি নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত না হয়, তবে এই বছরকে থামিয়ে রাখতে পারবে না কোনো ক্যালেন্ডারের পাতা। আগুনের বছর পরিণত হবে আগুনের যুগে।