ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

অ্যাকাউন্ট হ্যাক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য: জামায়াত আমিরের ক্ষোভ

অ্যাকাউন্ট হ্যাক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য: জামায়াত আমিরের ক্ষোভ

শেরপুরের মাটিতে এক জনাকীর্ণ জনসভায় দাঁড়িয়ে আজ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। বিশেষ করে তার এক্স বা সাবেক টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, এক ধরনের ইতর শ্রেণির লোক তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর মন্তব্য ছড়িয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি কেবল তার ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শকে হেয় প্রতিপন্ন করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ যখন বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ, তখন একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

রবিবার ১ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত এই জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান কেবল হ্যাকিংয়ের মধ্যেই তার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি নারী অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও দীর্ঘ আলোকপাত করেন। তিনি অত্যন্ত সরাসরি ভাষায় আক্রমণ করেন তাদের, যারা নারী অধিকারের কথা বললেও কার্যত নারীদের সম্মান দিতে জানে না। তার মতে, যারা নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে তারাই আবার ছদ্মবেশে ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামছে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দর্শনে নারীদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, তাদের দল ক্ষমতায় গেলে বা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে নারীদের ঘর, চলাচলের রাস্তা এবং কর্মস্থলে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এই বক্তব্যটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে নারী নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানি একটি চিরন্তন সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। আমিরের এই অঙ্গীকার মূলত নারী ভোটারদের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি কৌশলগত প্রয়াস হিসেবেও দেখছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের প্রসঙ্গ। ডা. শফিকুর রহমান বলেন যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। তাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সংগতি রেখে বেতন বৈষম্য দূর করা জামায়াতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই বেতন বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি মনে করেন, যদি সরকারি কর্মচারীদের স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়া অসম্ভব। প্রশাসনিক সংস্কারের এই রূপরেখা তিনি এমন এক সময়ে দিলেন যখন সামনে একটি জাতীয় নির্বাচনের আমেজ কাজ করছে।

সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধেও ডা. শফিকুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বিশেষ করে মায়ের প্রতি সহিংসতা বা অসম্মানের মতো জঘন্য কাজকে কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যে সমাজ মাকে সম্মান দিতে পারে না, সেই সমাজ কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের অসম্মানজনক আচরণকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা দেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রক্ষণশীল ভাবমূর্তির পাশাপাশি একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজ গঠনের বার্তা দিতে চেয়েছেন। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

নির্বাচনী প্রচারণা ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জামায়াত আমির অত্যন্ত কঠোর ও মারমুখী অবস্থানে ছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, আসন্ন দিনগুলোতে তাদের নির্বাচনী বা রাজনৈতিক প্রচারণায় যদি কেউ বাধা সৃষ্টি করে, তবে তা হাত গুটিয়ে সহ্য করা হবে না। যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা বাধা প্রদানকে তারা রাজনৈতিকভাবে এবং প্রয়োজনে রাজপথে প্রতিপ্রতিহত করবেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তার কর্মীদের চাঙ্গা করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি আগাম বার্তা দিলেন। রাজনীতির ময়দানে জামায়াতে ইসলামী যে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত এবং যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত, আমিরের কণ্ঠে সেই আত্মবিশ্বাসের সুরই ধ্বনিত হয়েছে।

শেরপুরের স্থানীয় রাজনীতির একটি স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়েও তিনি সোচ্চার হন। জামায়াত নেতা রেজাউল করিম হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করেন। হত্যাকাণ্ডের তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, কেন অপরাধীরা এখনো আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। রেজাউল করিম হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে তিনি বলেন, যদি অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে এর পরিণাম শুভ হবে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতির মূল কারণ বলে তিনি মন্তব্য করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে ক্ষোভ বিরাজ করছে, আমিরের এই বক্তব্য সেই ক্ষোভকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদী রূপ দিয়েছে।

বিশ্লেষক মহলের মতে, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য বহুমুখী অর্থ বহন করে। একদিকে তিনি নিজের ডিজিটাল প্রোফাইল রক্ষা করতে না পারার দায় হ্যাকারদের ওপর চাপিয়ে নৈতিক অবস্থান মজবুত করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে নারী অধিকার ও সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলে দলের জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হলে প্রতিহত করার যে ডাক তিনি দিয়েছেন, তা রাজপথে উত্তাপ ছড়াতে পারে। সব মিলিয়ে শেরপুরের এই জনসভা থেকে জামায়াত আমির কেবল তার ওপর হওয়া সাইবার আক্রমণের জবাবই দেননি, বরং আগামীর রাজনীতির একটি কড়া নীল নকশাও তুলে ধরেছেন। হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান হবে, কিন্তু তিনি যে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তার উত্তর খুঁজতে হবে রাজপথের হিসেবে-নিকেশে।