এখন সময় বিশ্লেষণ • প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বার ২০২৫, ০১:৪৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

অস্থিরতা সৃষ্টির অশুভ কামড়

অস্থিরতা সৃষ্টির অশুভ কামড়

নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরপরই যে অঘটনটি ঘটেছে, তা বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক গভীর উদ্বেগের সংকেত হয়ে উঠেছে। ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর এবং তাঁর অবস্থার সংকটাপন্ন বলে যে তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে এসেছে। নির্বাচনী পরিবেশকে মুহূর্তেই উত্তপ্ত ও অস্বস্তিকর করে তুলেছে। এই ঘটনাটি একক কোনো অপরাধমূলক সহিংসতা হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভেতরে রেখেই দেখা হচ্ছে।

তফসিল ঘোষণার পর বাংলাদেশে সাধারণত যে আশাবাদী নির্বাচনী আবহ তৈরির কথা, তার বদলে শুরুতেই রক্তাক্ত ঘটনার সংবাদ জনমনে আতঙ্ক ও সন্দেহ উভয়ই বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শিবির উভয় দিক থেকেই ঘটনার তীব্র নিন্দা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এবং একে ঘিরে পারস্পরিক দায় চাপানোর প্রবণতা স্পষ্ট। কেউ কেউ এটিকে পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার দিকটি সামনে আনছেন।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে ঘিরে পুরোনো আশঙ্কাগুলো নতুন করে ফিরে এসেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না এই প্রশ্ন আবারও জনআলোচনার কেন্দ্রে। অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে শিখিয়েছে, নির্বাচন এলেই একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে, যারা সহিংসতা, গুজব ও উসকানির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করতে চায়। ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাকে তাই অনেকেই সেই ধারাবাহিকতার একটি সূচনা পর্ব হিসেবে দেখছেন।

আরও উদ্বেগজনক যে আলোচনা সামনে এসেছে, তা হলো- পলাতক ও পরাজিত ফ্যাসিস্ট খুনি জালিম সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর কথিত তৎপরতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পাশের রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়ে বসে থাকা এই গোষ্ঠীটি সরাসরি রাজনীতিতে ফিরে আসতে না পারলেও, গোপনে নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার উপর প্রশাসনে ও সরকারের অন্যান্য ক্ষেত্রে সেই অশুভ শক্তির দোসররা তো ঘাপটি মেরে আছেই । নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে সহিংস ঘটনার সূচনা সেই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।

এখানেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে যে সহযোগিতামূলক মনোভাব প্রত্যাশিত, তার পরিবর্তে অবন্ধুসুলভ নীরবতা বা পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকটাই রাজনৈতিক ভাষ্য ও অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে, তবু দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় এগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে যখনই গণতান্ত্রিক উত্তরণ বা ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে।

সার্বিকভাবে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণাই শেষ কথা নয়, বরং সেটিই আসল পরীক্ষার শুরু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রশাসনের দৃঢ়তা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, এই সবকিছু এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওসমান হাদির ওপর হামলার মতো ঘটনা যদি দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে মোকাবিলা না করা হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবেই থাকবে না বরং গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর অনাস্থার ছায়া আরও গাঢ় করবে।

এই মুহূর্তে দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সহিংসতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রক্ষা করা। অস্থিতিশীলতা চায় যারা, তারা চায় ভয় ও অনিশ্চয়তার রাজত্ব। আর রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো সেই ভয়কে পরাজিত করে শান্তি, আস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচনকে ঘিরে চলমান এই উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় বিজয়।