যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে হাজার হাজার অভিবাসী এখন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় দেশজুড়ে নাগরিকত্ব প্রদানের চূড়ান্ত ধাপ অর্থাৎ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান (ন্যাচারালাইজেশন সেরেমনি) স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে যারা দীর্ঘ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে শপথ নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তারা এখন এক গভীর প্রশাসনিক গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছেন।
সংকট ও এর নেপথ্য কারণ
এই নাটকীয় পরিবর্তনের সূত্রপাত গত থ্যাঙ্কসগিভিং দিবসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো’ থেকে সব ধরনের অভিবাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেন। সমালোচকরা একে অভিবাসীদের ওপর এক ধরণের ‘সম্মিলিত শাস্তি’ হিসেবে দেখছেন। ডিসেম্বরের মধ্যে ট্রাম্পের এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত দেশের সংখ্যা ১৯ থেকে বাড়িয়ে ৩৯টিতে উন্নীত করা হয় এবং ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এই দেশগুলোর নাগরিকদের নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া স্থগিত করে।
৩৯টি দেশের তালিকা ও নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট
শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ১৯টি দেশের নাগরিকত্বের আবেদন ও শপথ গ্রহণ স্থগিত করেছিল। পরবর্তীতে সেই তালিকা সম্প্রসারিত করে ৩৯টি দেশে উন্নীত করা হয়। যদিও নিরাপত্তার খাতিরে সব দেশের নাম সবসময় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না, তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে এই তালিকায় মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং তথাকথিত ‘হাই রিস্ক’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত। তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশ হলো:
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা: সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, ইরাক।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া: আফগানিস্তান, পাকিস্তান।
আফ্রিকা ও অন্যান্য: চাদ, নাইজেরিয়া, ইরিত্রিয়া, মিয়ানমার (বার্মা), ভেনেজুয়েলা।
এই দেশগুলোর তালিকা তৈরির পেছনে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি’ বা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে পর্যাপ্ত ডাটাবেজ নেই বা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করে না, সেই দেশগুলোকে এই তালিকায় বেশি রাখা হয়েছে।
বর্তমান ইমিগ্রেশন আইনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন আইনে এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কঠোর পরিবর্তন আনা হয়েছে:
১. সর্বোচ্চ পর্যায়ের যাচাই-বাছাই (Extreme Vetting): এখন কেবল আবেদন করলেই হচ্ছে না, বরং আবেদনের পেছনের প্রতিটি তথ্য অত্যন্ত গভীরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এমনকি একজন অভিবাসী ১০-২০ বছর আগে কোনো ছোট অপরাধ করেছিলেন কি না বা তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে কোনো বিতর্কিত বিষয় আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২. জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি (Birthright Citizenship): ট্রাম্প বারবার ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনটি বন্ধ করতে চান। যদিও এটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, তবুও এই আলোচনা অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
৩. পাবলিক চার্জ রুল (Public Charge Rule): যদি কোনো অভিবাসী মনে করেন যে তিনি ভবিষ্যতে সরকারি সুবিধার (যেমন ফুড স্ট্যাম্প বা স্বাস্থ্যসেবা) ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন, তবে তার গ্রিনকার্ড বা ভিসা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
৪. কাজের ভিসা (H-1B) সীমাবদ্ধতা: দক্ষ কর্মীদের জন্য যে বিশেষ ভিসা ব্যবস্থা ছিল, সেখানেও বেতন এবং যোগ্যতার মাপকাঠি অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে মার্কিন নাগরিকদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা যায়।
৫. নির্বাসন প্রক্রিয়া জোরদার (Mass Deportations): প্রশাসন থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা যারা অনিয়মিতভাবে বসবাস করছেন, তাদের কোনো নোটিশ ছাড়াই গ্রেপ্তার এবং দ্রুত নির্বাসন দেওয়া হবে।
শপথের অপেক্ষায় দীর্ঘশ্বাস ও প্রশাসনের যুক্তি
সবচেয়ে পীড়াদায়ক দিক হলো, এই অভিবাসীদের অনেকেই ইতিমধ্যে নাগরিকত্ব পরীক্ষা এবং ইংরেজি ভাষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা ছিল চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ। নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আদ্রিয়ানো এসপাইল্লাত জানান, তার কার্যালয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের উদ্বেগের ফোন আসছে। তিনি বলেন, মানুষ এখন চরম মানসিক চাপে রয়েছে; তারা নিজেদের মনে মনে আমেরিকান ভাবলেও বাস্তবে শপথ না নেওয়া পর্যন্ত আইনি স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আগে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যাচাই-বাছাই বা ‘ভেটিং’ করার জন্যই এই বিরতি প্রয়োজন। তবে অভিবাসন আইনজীবীরা এই যুক্তিকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছেন। আমেরিকান ইমিগ্রেশন লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক শেভ দালাল-ধেইনি বলেন, এই প্রার্থীরা ইতিমধ্যে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অসংখ্যবার সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তাদের তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি পরামর্শ
প্রতিনিধি প্রমিলা জয়পাল এবং অন্যান্য আইনপ্রণেতারা এই স্থগিতাদেশের কারণ এবং সময়সীমা জানতে চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। জয়পাল নিজেও একজন অভিবাসী হিসেবে নাগরিকত্ব পাওয়ার স্মৃতির কথা উল্লেখ করে বলেন, যারা সব নিয়ম মেনে এখানে পৌঁছেছেন তাদের সাথে এমন আচরণ করা অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমানে এই কঠিন পরিস্থিতিতে অভিবাসন আইনজীবীরা কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন:
নথিপত্র হালনাগাদ রাখা: প্রতিটি ট্যাক্স ফাইল, আয়ের উৎস এবং ঠিকানার নথিপত্র স্বচ্ছ রাখা।
আইনি পরামর্শ: নাগরিকত্ব বা গ্রিনকার্ডের আবেদন স্থগিত হলে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সরকারের কাছে কারণ জানতে চাওয়া।
সতর্কতা: এমনকি বৈধ অভিবাসী হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো ছোটখাটো আইনি জটিলতা এড়িয়ে চলা।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বৈধ অভিবাসনের ভিত্তিকে সরাসরি আঘাত করছে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ নতুন নাগরিক শপথ নেন, যাদের একটি বড় অংশ মেক্সিকো, ভারত ও ফিলিপাইন থেকে আসেন। এই ধরণের সিদ্ধান্ত কেবল বর্তমান প্রার্থীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং আমেরিকার বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে ‘অভিবাসীবান্ধব দেশ’ থেকে ‘অভিবাসী-বিদ্বেষী দেশে’ রূপান্তরিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। গ্রিনকার্ড পাওয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘ বছরের অপেক্ষার পর নাগরিকত্বের এই প্রশাসনিক জটিলতা যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।