ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

'বহুমাত্রিক বাংলাদেশ' প্রতিপাদ্যে বইমেলার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

'বহুমাত্রিক বাংলাদেশ' প্রতিপাদ্যে বইমেলার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

"বই কেবল অবসর যাপনের সঙ্গী নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্কের এক অনন্য সঞ্চয় বা ব্যাংক।"—এমন মন্তব্য করে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি মেলার উদ্বোধন করেন। এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।

উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পরপরই সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি অংশের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

সময়সূচি ও পরিসর

আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে এবারের বইমেলা। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। তবে ছুটির দিনগুলোতে (শুক্র ও শনিবার) সকাল ১১টা থেকেই মেলায় প্রবেশ করা যাবে। প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ থাকবে।

এ বছর ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি অংশে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮টি। শিশুদের জন্য বরাবরের মতো থাকছে বিশেষ ‘শিশু চত্বর’ (৬৩টি স্টল) এবং লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে রাখা হয়েছে ৮৭টি স্টল। প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকছে বিশেষ ‘শিশুপ্রহর’।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ ও প্রস্তাব

বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, নিয়মিত পাঠাভ্যাস মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি বাড়ায় এবং আলজাইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি কমায়। তবে আন্তর্জাতিক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন যে, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ৩টি বই পড়েন।

তরুণদের ইন্টারনেটে আসক্তি ও বইবিমুখতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "ইন্টারনেটে তথ্য পাওয়া গেলেও কাগজের পাতায় কালো অক্ষরের যে গভীরতা, তা অন্য কোথাও সম্ভব নয়।" তিনি আগামী বছর থেকে অমর একুশে বইমেলাকে ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে আয়োজন করার প্রস্তাব করেন। একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

নিরাপত্তা ও বিশেষ আয়োজন

মেলার মূলমঞ্চে প্রতিদিন বিকেল ৩টায় সেমিনার এবং ৪টা থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে।

২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সাংস্কৃতিক মহলে নতুন এক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যটি বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গণতান্ত্রিক পরিবেশে দল-মত নির্বিশেষে একটি মানবিক সমাজ গঠনের যে ডাক প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা বইমেলার চিরাচরিত চেতনার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ।

তবে আন্তর্জাতিক জরিপে বই পড়ার অভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে থাকা আমাদের জন্য একটি ‘এলার্মিং’ বার্তা। মেলাকে কেবল উৎসব হিসেবে নয়, বরং প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থাৎ জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার যে পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অমর একুশে বইমেলাকে ‘আন্তর্জাতিক’ রূপ দেওয়ার প্রস্তাবটি দেশের প্রকাশনা শিল্পের জন্য বৈশ্বিক দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে প্রকাশকদের অভিযোগ ও স্টল বরাদ্দের সমন্বয়হীনতা দূর করা গেলে এই মেলা সত্যিকার অর্থেই ‘জ্ঞানের সূতিকাগার’ হয়ে উঠবে। 'ফ্যাসিবাদমুক্ত' বাংলাদেশে বইমেলা যেন মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তার অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়—এটাই এখন সাধারণ পাঠকদের প্রত্যাশা।