|
বিশেষ সংখ্যার প্রিন্ট এডিশন



|
নবম বর্ষের শুরম্নতে
আমাদের
কথা
দ্রম্নত ফুরিয়ে যায়। খুবই দ্রম্নত। সময়। মানুষের জীবনের মূলধন সময়। বিজ্ঞ
বুদ্ধিমানরা তাই সময় অপচয় করেন না। অতীত নিয়ে অনুসূচনা করেন না। অতীত থেকে
শিৰা গ্রহণ করেন। ভবিষ্যতের কল্পনাবিলাশ নয়, পরিকল্পনা করেন। বর্তমানকে
কাজে লাগান। যে সময় চলে গেছে তা ফুরিয়ে গেছে। এখন যে সময় তা ফুরিয়ে যাবে,
তাই তা কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়া এই 'এখন সময়'র অর্থ। ফুরিয়ে যেতে যেতে আমরা
চলে এসেছি ৯ বছরে। সবসময়ই 'এখন সময়' পরিবেশ পরিস্থিতির উপযোগী থেকে
অগ্রগতিতে অগ্রণীয়। প্রথম সংখ্যা থেকে গত ৮ম বর্ষের শেষ সংখ্যাটি পর্যনত্দ
'এখন সময়' হাতে নিয়ে তাই পাঠক বলেন : চমৎকার। আর একটি মনত্দব্য : ভাল হচ্ছে
_ একই মনত্দব্য ৮ বছর আগে প্রথমাবস্থায় যেমন শুনেছি, এখনো শুনছি। আমাদের
কাছে তার অর্থ ভাল করার চেষ্টায় আমরা থেমে নেই।
২.
মানুষের যোগ্যতা ও কর্মৰমতা স্রষ্টা প্রদত্ত। স্রষ্টার আমানত। জীবনকাল
নির্দেশিত পথে তা প্রয়োগ করার জন্য মানুষ দায়বদ্ধ। সে দায় শোধ করার জন্যই
নিজ নিজ যোগ্যতানুসারে সংশিস্নষ্ট মানুষকে কাজ করে যেতে হয়, ফলাফল-পরিণতি
না জেনেও। আর ভাল কাজের প্রতিদান একালে বা পরকালে। এই বিশ্বাস ধারণ করেই
'এখন সময়'র জন্ম। সেই ঈপ্সিত লৰ্যে ধীরে ও সচেতনভাবে এগিয়ে চলার পথে আমাদের
ত্রম্নটি-বিচু্যতি নির্দেশ করবেন সম্মানিত পাঠক। পাঠকের তীক্ষ্ন পর্যবেৰণ ও
বিচু্যতি নির্দেশকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বাগত জানাই। 'এখন সময়' তাই ভিন্ন
বৈশিষ্ট্যের। এই বৈশিষ্ট্য শুধু মত, আদর্শের বা চিনত্দার নয়। সংবাদ
নির্বাচন, পরিবেশন, বিশেস্নষণে যেমন তেমনই অঙ্গ সজ্জা ও বিন্যাসে। প্রতিটি
সংখ্যাই পাঠকের কাছে দৃষ্টিনন্দন ও সুখপাঠ্য করার জন্য একদল সৃজনশীল
প্রগতিবাদী সদা নিবেদিত। তারাই এখন সময়'র প্রাণ। সবাই দায়বদ্ধতা থেকেই
অনুপ্রাণিত।
৩.
সংকট জীবনের সাথে ওতপ্রোত। সমস্যা উত্তরণ করেই সময় এগিয়ে চলে রেললাইনের
মতই পাশাপাশি। দ্বন্দ্ব করে নয়। আমরাও সে পথেই। এভাবেই ৯ বছরে। বিগত
দিনগুলোতে পাঠকের উপর নির্ভর করে আমাদের এ পর্যনত্দ আসা। আমাদের
পাঠক-পৃষ্ঠপোষকদেরকে বরাবরের মতই কৃতজ্ঞতা জানাই। আর যারা চলার পথে সঙ্গে
থেকেছেন সকল প্রতিকূলতা সংকট উত্তরণে সমব্যাথি- সাথী হয়েছেন তাদের কৃতজ্ঞতা
জানানো শুধু আনুষ্ঠানিকতা। এতে ঋণ শোধ হবে না। ঢাকা অফিসের ৰেত্রেও তথৈবচ।
কাজী জিয়া শামস্, রাফি শামস্ নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে কৃতিত্বের অংশীদার।
কাজী রাহাত শামস ও তার অফিসের সহকর্মী মশিউর রহমান রম্নবেল, খন্দকার এনামুল
হক, জবাদুল আখতার, আব্দুছ ছামাদ খানসহ সবাইকে এই উত্তরণে আর একটি বছর
পর্যনত্দ টেনে আনার সহযোগিতার জন্য যারপরনাই ধন্যবাদ। নিয়মিত লেখা দিয়ে এখন
সময়কে যারা সমৃদ্ধ করে চলেছেন, তারা হলেন মাহমুদুর রহমান ও রইসউদ্দিন আরিফ।
আহমদ হোসেন মানিক সবার নেপথ্যে চালিকাশক্তি। 'এখন সময়' পরিবারের নিউইয়র্ক
অফিস ও আমার সহকর্মীদের পৰ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা।
নিউইয়র্কে আমাকে যারা সার্বিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন তাদের তালিকা এত
দীর্ঘ যে, কারো নামই উলেস্নখ না করে সবার প্রতি আমার সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা।
সাংবাদিকতা কি শুধুই একটি প্রফেশন : না মিশন
সাঈদ
তারেক
কথাটা বলেছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে রহস্যপুরম্নষ হিসেবে খ্যাত সিরাজুল আলম
খান। ২৪/গ টিপু সুলতান রোডে পুরো চারতলা ভবনটা জুড়ে দৈনিক গণকণ্ঠের অফিস।
জীবনের অনেকগুলো দিন রাত কাটিয়েছি এই ভবনে। ৭৪-এর দিককার কথা। মেহনতি
মানুষের মুখপত্রের কাগজে-কলমে মালিক তখন মেহনতি মানুষের মুখপাত্র অর্থাৎ
জাসদের কেন্দ্রীয় নেতারা। সাংবাদিক-কর্মচারীদের কয়েক মাস বেতন বাকি।
দুর্ভিৰের বছর। নূ্যনতম বেতন নিয়ে আমরা যারা কাজ করছি সকলেরই নুন আনতে
পানত্দা ফুরায়। তার ওপর কয়েক মাস বেতন না পাওয়ায় অবস্থা মধুসূদন। আমরা
সাংবাদিক-কর্মচারীরা বকেয়া আদায়ে আন্দোলনের কর্মসূচি দিলাম। ব্যাপারটা তখন
জাসদ নেতাদের জন্য প্রেস্টিজ ইসু্য হয়ে গেল। মেহনতি মানুষের অধিকার কায়েমের
জন্য তারা আন্দোলন করেন আর তাদেরই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মেহনতি মানুষেরা
ন্যায্য পারিশ্রমিক আদায়ে আন্দোলন করছে - এতে বেশ বিব্রত হলেন গণকণ্ঠের
মালিক পৰ। দাদা অর্থাৎ সিরাজুল আলম খান মালিকপৰের কেউ নন, তবে নেপথ্য থেকে
তিনিও জড়িত-এর প্রকাশনার সাথে। প্রায়ই আসতেন অফিসে। বেশ কিছুৰণ ধরে বসতেন।
এক সন্ধ্যায় বসলেন আমাদের সাথে। প্রায়ই আমরা মানে যারা পাওনা আদায়ের
আন্দোলন করছি। বোঝানোর চেষ্টা করলেন দেশের অবস্থা, রাজনীতির অবস্থা। এ
প্রেৰাপটে গণকণ্ঠের ভূমিকা। একপর্যায়ে বললেন, জানো সাংবাদিকতা হচ্ছে একটি
মিশন। এটা শুধুমাত্র প্রফেশন হতে পারে না। মিশনারী দিল নিয়ে সাংবাদিকতা
করতে না পারলে কখনো প্রকৃত সাংবাদিক হতে পারবে না।
দাদার কথাটা সেদিন থেকেই গেঁথে আছে মনে। প্রায় চার দশক হতে চললো এ লাইনে।
এই সুদীর্ঘকাল ধরেই বিষয়টা নিয়ে ভাবছি। সাংবাদিকতা কি আসলেই একটা মিশন না
শুধুমাত্র একটা প্রফেশন। '৮০ এর মে মাসে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্যোগে
বাংলাদেশের শ্রম আইনের ওপর একটা সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। বিভাগীয়
সম্পাদক হিসেবে তা আয়োজনের দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। তিন দিন ধরে আলোচনা।
শ্রমিক নেতারা সকলেই বক্তব্য রাখলেন। শেষ দিনে সেমিনারের সুপারিশনামা তৈরি
করতে বসে সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সাথে আমার মতানত্দর হলো। বিষয়টা ছিল
সাংবাদিক ইউনিয়ন কি আদমজীর শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে চরিত্রগত দিক থেকে পৃথক। না
দুই ইউনিয়নের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। পাকিসত্দান আমলের কথা জানি
না, তবে স্বাধীনতার পরের এক দশকে দেখেছি। সংবাদপত্রের সমস্যা নিয়ে ইউনিয়ন
আন্দোলন করেছে। তবে তা ছিল সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদার সাথে সম্পর্কযুক্ত।
সংবাদপত্রের অপর দুই ফেডারেশন, প্রেস শ্রমিক এবং সাধারণ কর্মচারীদের সংগঠন
যেভাবে দাবি আদায়ের আন্দোলন করতো সাংবাদিক ইউনিয়নের কৌশল ছিল তার থেকে
ভিন্ন। ওই দুই সংগঠনের মুখ্য বিবেচ্য ছিল রম্নটি-রম্নজির বিষয়। সাংবাদিক
ইউনিয়ন বিশেষভাবে কনসাকড ছিল দেশের গণতন্ত্র সংবিধান, মৌলিক অধিকার
মানবাধিকার বিষয়ে। যতদূর মনে পরে ৮০-এর দশকের আগ পর্যনত্দ রম্নটি-রম্নজির
বিষয়ক দাবি আদায়ে সংবাদপত্রের তিন ফেডারেশন ঐক্যবদ্ধ কোন কর্মসূচিও দিতে
পারেনি। সেদিন ইকবাল ভাই যখন আদমজীর শ্রমিক ইউনিয়ন আর সাংবাদিক ইউনিয়নকে এক
কাতারে ফেলতে যে যুক্তি দিলেন আমি তা মেনে নিতে পারিনি।
মাসে একশ' টাকা বেতনে সাংবাদিকতা জীবনের শুরম্ন। স্বাধীনতার পর গণকণ্ঠে
বেতন হলো একশ' তেইশ। রিপোটিংয়ে স্থানানত্দরিত হওয়ার পর কনভেন্স এলাউন্স
দুইশ' টাকা যোগ হলো। সকুল্যে তিনশ' তেইশ। তাতেই আমরা খুশি। ওই টাকা দিয়েই
চলেছি। টাকাটাকে সে সময় বড় করে দেখিনি। কাছাকাছি এ্যাসাইমেন্টে হেঁটে
যেতাম। একটু দূরে হলে রিকশা বেশি দূরেরটা বাসে। মাঝে মাঝে ভাবতাম একটা
মোটরসাইকেল হলে ভাল হতো। কিন্তু সে সাধ্য কোথায়। এরও শেষ নেই। একদিন অবাক
হয়ে দেখলাম ইত্তেফাকের ফারম্নক একটা গাড়ি কিনেছে!
ইয়েলো জার্নালিজম কথাটা তখনো প্রচলিত হয়নি। সাংবাদিকতার নাম করে
বস্ন্যাকমেলিং ব্যাপারটা ভাবতেই ঘেন্না ধরতো। সাংবাদিকতা যে এক ধরনের
ব্যবসা হতে পারে এটাও কখনো মাথায় আসেনি। ষাট এবং সত্তরের দশকে যারা
সাংবাদিকতা করেছেন আমার বিশ্বাস প্রত্যেকেই এসেছিলেন কোন না কোন আদর্শের
তাড়নায়। কারো কারো পেশাটা হলো এক ধরনের নেশা। ভালোভাবে খেয়ে পরে বেঁচে
থাকার জন্য অন্য পেশা অবলম্বনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এদের অনেকেই দারিদ্র্য
এবং নিত্য অভাববকে সাথী করে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে ছিলেন। সত্তরের দশকের
শেষ থেকে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। নতুন নতুন লোক আসেন এ পেশায়। নতুন
দৃষ্টিভঙ্গি। পাল্টে যেতে থাকে সাংবাদিকতার চরিত্র। বদলে যায় সাংবাদিকতার
সংজ্ঞা। বল পয়েন্ট কল দিয়ে নিউজপ্রিন্ট কাগজে লেখার সুযোগ আর নেই। এসেছে
কম্পিউটার। ল্যাপটপ, গ্যালী স্টিক, লেড, কোয়ারেট কাকে বলে আজকের সাংবাদিকরা
হয়তো জানেনও না তা। কপি পেস্ট, ফটোশপ কোয়ার্ক। ঘরে বসেই সংবাদপত্র তৈরি করে
ফেলা যায় আজ। যুগের সাথে পাল্টেছে সংবাদপত্র সাংবাদিকতার ধরন। যারা যুক্ত
হয়েছেন এ শিল্পে, যারা জড়িয়েছেন সাংবাদিকতা পেশায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও
আলাদা। কারো কারো কাছে এ পেশা নিছকই একটা রম্নটি-রম্নজির মাধ্যমে। কেই হয়তো
সাফ্যের সিঁড়ি হিসেবে নিয়েছেন। এ পেশায় আজকে অনেকে নামকরা সাংবাদিক হয়েছেন।
নানাভাবে প্রতিষ্টিত। এরা সাংবাদিকতার নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন।
সংবাদপত্রের নতুন আইন তৈরি করেছেন। হয়তো এটাই যুগের দাবি। কিন্তু যুগ
পাল্টানোর সাথে সাথে সাংবাদিকতার সত্তাও পরিবতর্তিত হয়ে যাবে কিনা-আমি
নিশ্চিত নই।
নিউইয়র্ক থেকে এখন বেশ কয়েকটি পত্রিকা বের হচ্ছে এবং কিভাবে বের হচ্ছে,
কিভাবে টিকে আছে অনেকেরই খবরই কিছু কিছু করে জানি। এসব পত্রিকার অনেকগুলোই
সংবাদপত্রের মানদন্ডে কতটুকু উত্তরীয় সে বিতর্কে না গিয়েও আমি চাই বাংলা
ভাষায় কিছু নিয়মিত প্রকাশনা থাকুক। অনত্দত এখানে বসবারত বাঙালিরা তাদের
বাংলা পাঠ্যাভাসের চর্চাটা টিকিয়ে রাখুন। বই পড়ার সময় তো কারো হয়ে ওঠে না।
এইসব প্রকাশনার মধ্যে 'এখন সময়' পত্রিকাটিকে গোড়া থেকেই আমার কাছে একটু
ভিন্ন জাতের বলে মনে হয়েছে। একই ধারণা আমার মত আরো অনেকেরই। পাঁচ বছর যাবত
দেখছি কাগজটাকে। পাঁচ বছর ধরেই শুনছি কাজী ভাইয়ের আর্থিক দৈন্যতার কথা।
তারপরও তিনি বের করে চলেছেন। বিরামহীন। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে। অনেকের মত
আমার কাছেও এ এক অপার বিস্ময়!
কাজী ভাইকে যারা চেনেন, জানেন, অনেকেই বলেন, এত কষ্ট করে এত পরিশ্রম করে
ভদ্রলোক কাগজটা বের করে চলেছেন। কি পান তিনি বিনিময়ে। এ প্রশ্ন আমারও। কি
পান তিনি? প্রতি সপ্তাহে আয়ের পুরোটাই ঢেলে দেন এর পেছনে। তাতেও কুলোয় না।
তারপরও থেমে নেই। আটটি বছর পার হলো। বাহান্নটা করে হলেও আট বছরে চারশ'র
ওপরে সংখ্যা বের করেছেন। সম্পূর্ণ একার চেষ্টায় শুধুমাত্র
পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় এই দীর্ঘ সময় ধরে এতগুলো সংখ্যা প্রকাশ করা
নিঃসন্দেহে রীতিমতো এ্যাডভেঞ্চার। গত পাঁচ বছরেই দেখেছি অনেক নতুন কাগজ
এসেছে, কিছুদিন পর ঝরেও গেছে। কিন্তু এখন সময়কে কাজী ভাই মরতে দেননি। বরঞ্চ
দেখছি শত প্রতিকুলতার মধ্যেও চেষ্টা করে চলেছেন কিভাবে পৃষ্ঠা সংখ্যা
বাড়ানো যায়। মান বাড়ানো যায়। পাঠকের কাছে আরো আকর্ষণীয়।
উত্তর আমার কাছে আছে। এটা সম্ভব হয়েছে এ কারণেই যে, কাজী ভাই সংবাদপত্রের
সেই সুবর্ণ যুগের মানুষ। সাংবাদিকতাকে যারা শুধু একটি প্রফেশন মাত্র নয়,
মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই একই মিশনারী নিয়েই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন
আজো। সেই আনত্দরিকতা-নিষ্ঠার গুণেই তিনি টিকে আছেন আজো। গত আট বছরে তিনি
প্রমাণ করেছেন। সৎ সাংবাদিকতার আদর্শের মৃতু্য নেই। এই আদর্শই তাকে বাঁচিয়ে
রাখবে বাংলা সংবাদপত্রে পাঠকদের হৃদয়ে।
'এখন সময়' নিয়মিতই প্রকাশিত হবে। 'এখন সময়' টিকে থাকবে আনত্দরিকতা, নিষ্ঠা,
সততা আর আদর্শের অনত্দর্নিহিত শক্তির জোরে।
এখন সময় এবং আমি
ফকীর
সেলিম
এসটিভি ইউএস এর সংবাদ বিভাগের পুরো দায়িত্ব ঘাড়ে আসার পূর্ব পর্যনত্দ এখন
সময়ের একজন নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর ছিলাম। এখন সময়ের অষ্টম বর্ষপূর্তি সংখ্যায়
কিছু কথা লিখেছিলাম। কথা বলছি এ কারণে যে ওটাকে কোন লেখার পর্যায়ে ফেলা
যায়না। এখন সময়ের নবম বর্ষপূর্তি সংখার জন্যও কিছু কথা বলার চেষ্টা করি।
'আজকের শিরোনাম' নামে এসটিভির একটি টকশোর হোস্টিং করা এবং এখন সময় সম্পাদক
কাজী শামসুল হককে ঐ অনুষ্ঠানের আলোচক হিসাবে পাওয়ার কারণে তাঁর সাথে আমার
সখ্যতা গড়ে উঠে। ওনার বড় ছেলে কাজী জিয়া শামস বাংলাদেশে বেশ পরিচিত একজন
বনসাই শিল্পি। এ প্রসঙ্গে বনসাই সম্পর্কে অল্প কিছু তথ্য দেই।
বনসাই হচ্ছে ছোট্ট পাত্রের মধ্যে বৃৰ লালন পালন করার এক ধরণের জাপানী
শিল্প। বলা চলে এ্যাসথেটিক মিনিয়েটারাইজেশন অব ট্রি'জ। চাইনিজ শব্দ পেনজাই
থেকে বনসাই শব্দের উৎপত্তি। পরবর্তীতে জাপান, কোরিয়া এবং ভিয়েতনামে বনসাই
শিল্প জনপ্রিয়তা লাভ করে। ছোট্ট পাত্রে বছরের পর বছর ধরে একটি গাছকে কেটে
ছেটে বিভিন্ন অবয়বে বাঁচিয়ে রাখা এবং একটি শৈল্পিক রূপ দেয়াই বনসাই।
জাপানের টোকিওতে হাপ্পোয়েন নামের একটি প্রাইভেট বাগানে ছোট্ট পাত্রে ৮০০
বছরের পুরোনো বনসাই এখন পর্যনত্দ সবচেয়ে পুরোনো বনসাই। কালক্রমে এই বনসাই
শিল্প বিশ্বের প্রায় সর্বত্র জনপ্রিয়তা লাভ করে যা বাংলাদেশেও এখন একটি
আকর্ষণীয় শিল্প মাধ্যম। বাংলাদেশের হাতে গোনা দশ বারোজন বনসাই শিল্পির
মধ্যে কাজী জিয়া শামসের নাম উলেস্নখযোগ্য।
যাইহোক, জিয়ার সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বনসাইয়ের সুবাদেই। ১৯৯৬ সাল থেকে
২০০৫ সাল পর্যনত্দ জাপানী দূতাবাসে কাজ করার সময় প্রতি বছরই দুই তিনবার
এম্ব্যাসীর উদ্যোগে বনসাই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হত। আমিই প্রদর্শনীগুলোর
সমন্বয় করতাম। ফলে জিয়া শামসের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। আমেরিকায় আসার
আগে থেকেই জানতাম জিয়া নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এখন সময় পত্রিকার বাংলাদেশ
প্রতিনিধি।
কাজী ভাইয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার পর যখন জানলাম উনি জিয়ার বাবা তখন কোন কারণ
ছাড়াই একটু বেশী ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। পরিচয়ের প্রথম দিকে ওনাকে আংকেল সম্বোধন
করতাম। এক সময় মনে হল যেহেতু উনি আমার অনুষ্ঠানের আলোচক, আংকেল সম্মোধন
করলে একটু আড়ষ্টতা থাকে। বললাম আপনাকে কাজী ভাই ডাকব। সহাস্যে রাজী হলেন
কাজী ভাই। আংকেল থেকে ভাই এবং এক সময় বন্ধুর মতই হয়ে গেল সম্পর্ক। পেশাগত
নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হত।
এভাবে চলতে চলতে একদিন এখন সময়ের জন্য লেখার অফার দিলেন। এসটিভির সকালের
খবর তখন হত ১১টায়। ঢাকা থেকে নিউজের একটা স্ক্রিপ্ট আসত। সাভর্ারে ফুটেজ
আসত। সাথে ইন্টারন্যাশনাল আইটেমগুলো এপিটিএনের সহায়তায় এখানেই তৈরী করতাম
আমি, সবুজ এবং অজনত্দা মিলে। লোকাল ইভেন্টগুলোর মধ্যে বাছাই করে দুয়েকটি
খবর ন্যাশনাল নিউজে দিতাম। বাকীগুলো প্রবাস পরিক্রমার জন্য রেখে দেয়া হত।
সকালের এবং দুপুরের সংবাদের দায়িত্ব ছিল আমার। বিকালে দর্পন কবীর আপডেট
দিয়ে সন্ধ্যা এবং রাতের খবর তৈরী করতেন।
লোকাল ইভেন্টগুলো নিয়ে প্রবাস পরিক্রমা প্রচার করা হত বুধবার। ওটা পুরোপুরি
দর্পন কবীর করতেন। সংবাদপত্রের খবর নিয়ে প্রতিদিনকার আলোচনার অনুষ্ঠান
আজকের শিরোনামও দর্পন কবীরের পরিচালনায় হত। তবে আজকের শিরোনামের মূল হোস্ট
ছিলেন রাজিব আহসান। প্রতিদিন একই লোক না করে একটু বৈচিত্র আনার জন্য পরে
অবশ্য হোস্ট হিসাবে ঐ অনুষ্ঠানে রাজিব ছাড়াও দর্পন কবীর, আমি, আকবর হায়দার
কিরন এবং আরজু ভাইকে যুক্ত করা হয়। নিয়মিত আলোচক হিসাবে ছিলেন সৈয়দ
মোহাম্মদ উলস্নাহ, কাজী শামসুল হক, নাজমুল আহসান, মাহবুবুর রহমান, ডা:
ওয়াজেদ এ খান, মইনুদ্দিন নাসের, লাভলু আনসার, মুজাহিদ আনসারি, মিজানুর
রহমান। পরবর্তিতে ডা: নাফিস, শেখ সিরাজুল ইসলাম, আবু তাহের, সালাহউদ্দিনও
মাঝে মধ্যে আসতেন।
সুখে শানত্দিতেই সময় কাটছিল। প্রতিদিন ভোরে জ্যামাইকার হলিস থেকে গাড়ী
চালিয়ে এ্যাস্টোরিয়ার এসটিভি অফিসে গিয়ে সকালের খবরের স্ক্রিপ্ট লিখতাম এবং
বুলেটিন তৈরী করে বিকালে এখন সময় অফিস হয়ে বাসায়। কোনদিন ইচ্ছা হলে দুএকটি
রিপোর্ট লিখতাম, না হলে খানিৰন আড্ডা দিয়ে চলে যেতাম।
মূল কাজ ছিল সোমবার রাতে। এখন সময় অফিসে যেন উৎসব। খাওয়া দাওয়া বা নাচ
গানের উৎসব নয়। একটি কম্পিউটারের কী-বোর্ডের শব্দের উৎসব। আমার আবার বাংলা
কম্পোজ এক আঙ্গুলের। অতি পুরোনো একটি ক্রিম কালারের ম্যাক কম্পিউটার।
অনেকটা এন্টিক হিসেবেই এখন সময় অফিসে এমন ক'য়েকটি কম্পিউটার শোভা পাচ্ছে।
এরই একটি আমি দখল করেছি.....কম্পোজের সময় স্পিডের চেয়ে খটখট আওয়াজ হয় বেশী।
ফলে অফিসে সোমবার রাতে নতুন কেউ ঢুকলেই আমার কম্পোজের শব্দে অবাক হয়ে না
তাকিয়ে পারতেন না।
যাইহোক ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে দর্পণ কবীর এসটিভি ছেড়ে দিয়ে বিদেশ বাংলা
নামে একটি সাপ্তাহিক বের করেন। ফলে এসটিভির নিউজের সব দায়ভার আমার ঘাড়ে।
এখন সময়'র জন্য বরাদ্দকৃত সময়টুকু আর থাকে না। কাজী ভাইকে বলি এখন সময়
আপাতত ছাড়তে হচ্ছে। উনি বলেন কি আর করা।
এসটিভিতে আগে শুধুমাত্র নিউজের স্ক্রিপ্ট করতে হত। ক্রমে সেখানে লোকবল কমতে
থাকে। একে একে বিভিন্ন কাজ একাই করতে হয়। স্ক্রিপ্ট লেখার পর নিউজ
কাস্টারকে স্টুডিওতে নিয়ে নিউজ সেটে বসানো, লাইটিং, ক্যামেরা চালানো,
এডিটিং এবং শেষমেষ ব্রডকাস্টিং। এসটিভির সবেধন নীলমনি বলতে থাকে সাইদ,
শাহেদ করিম, নীপু, আর আমি। ২০০৭ সালের অক্টোবর মাস পর্যনত্দ এই কয়জন মিলে
কোনক্রমে টিকিয়ে রাখি। ২৪ ঘন্টার একটি টিভি স্টেশন, মানুষ মাত্র হাতে গোনা
৪ থেকে ৫ জন। এক সময় বন্ধ হয়ে যায় এসটিভি।
আবারো ফিরে আসি এখন সময়ে। এবার আগের মত করে নয়। আরো জোরে সোরে, কিছুটা
দয়িত্ব নিয়ে। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে বলতে গেলে ফুলটাইম। রিপোর্ট
লিখি, ছবি তুলি। সাথে যোগ দেয় সাইদ ভাই।
লোকজন মাঝে সাঝে জিজ্ঞেস করে এখন সময়ে কি কাজ করি। নিজেই একটা পদবী বানিয়ে
নেই। বলি নির্বাহী সম্পাদক। সাইদ ভাইকে বলি চীফ রিপোর্টার। পরিচয় দিতে হয়
তাই। আসলে এখানে যারা কাজ করেন তারা পদের কথা চিনত্দা করেন না, যা করতে হবে
সেটাই করেন। এমন একটা ট্রেডিশন চালু হয়ে আছে এই অফিসে। মানুষ জানতে চায়
বলেই নিজেরা পদবীগুলো বানিয়ে নেই।
এখন সময়ে ভালই সময় কাটে। স্থানীয় বাংলাদেশী কমিউনিটি নিয়েতো গতানুগতিক
রিপোর্টিং আছেই। সাথে কিছু ইনভেস্টিগেটিভ স্টোরিও লেখার চেস্টা করি।
ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স, অর্থনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ, শিৰা, স্বাস্থ্য, অপরাধ,
নানা বিষয় নিয়ে এই তিন বছরে শতাধিক স্টোরি আমিই তৈরি করেছি। অনেক স্টোরির
জন্য পাঠকদের প্রশংসা পেয়েছি, পেয়েছি সমালোচনাও।
এখন সময় নিয়ে প্রায় সব পাঠকই ইতিবাচক মনত্দব্য করে- পত্রিকার গেট-আপ ভাল,
মেক-আপ ভাল, দেখতে ভাল, কন্টেন্ট ভাল, আর্টিকেলের সিলেকশন ভাল, ইত্যাদি।
কিন্তু কষ্ট লেগেছে যখন একদিন পত্রিকা ডেলিভারি দিতে গিয়ে।
কাজী ভাই বললেন যেহেতু জ্যামাইকায় থাকি ঐ এলাকার দোকানগুলোতে আমি ডেলিভারি
দিতে পারি কি না। গেলাম একদিন। প্রথমেই পারসনস বুলেভার্ডের ওপর পসরা
গ্রোসারীতে গিয়েই মন খারাপ হয়ে গেল। ঐ দোকানে গত সপ্তাহে দেয়া ২০টা
পত্রিকার মধ্যে মাত্র অর্ধেক বিক্রি হয়েছে। বাকীগুলো ফেরত নিতে হবে। বিক্রি
হওয়া পত্রিকার দাম দোকানী আমাকে দিলেন। খানিকটা লজ্জা পাওয়ার মত অবস্থা।
আমি ওনাকে বললাম পত্রিকা কেনে না কেনো মানুষ? উনি বললেন যে কেনার সেতো
কেনেই। বাকীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে চলে যায়।
পুরোনো সংখ্যাগুলো নিয়ে গাড়ীর ট্রাংকে রেখে আশাহত হয়ে অন্য দোকানে গেলাম।
একে একে জ্যামাইকার হিলটপ গ্রোসারী, ঢাকা গ্রোসারী, মান্নান
সুপারমার্কেট, ফাতেমা গ্রোসারী, বনফুল গ্রোসারী, আমাদের গ্রোসারী,
কাওরান বাজার এবং ১৭৯ স্ট্রিট ও হিল সাইডের ওপরস্থ নিউজ স্ট্যান্ডগুলিতে
গিয়ে কয়েকটি দোকান ছাড়া মোটামুটি একই ধরনের রেজাল্ট পেলাম।
সবগুলো দোকানেই পত্রিকা কম কেন বিক্রি হয় জানতে চাইলাম। দোকানদাররা খানিকটা
বিরক্ত হয়ে বললেন, 'আরে ভাই মাইনষে চা সিগরেট খাইতাছে দিনে ৮/১০ ডলার খরচ
কইরা অথচ ১ ডলার দিয়া পত্রিকা না কিনে দোকানে দাড়াইয়া পইড়া চইলা যায়'।
সেইদিন ডেলিভারি থেকে ফিরে কাজী ভাইকে বললাম আমি আর পত্রিকা ডেলিভারি দিতে
যাবো না।
মনে মনে ভাবলাম পত্রিকায় আর লিখবোও না। কারণ সারা সপ্তাহ খেটে খুটে প্রতিটা
মিনিট ব্যায় করে কত কষ্ট করে এক একটা রিপোর্ট লিখেছি, অথচ পাঠকেরা তা পড়ার
জন্য কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পত্রিকায় লিখে কি হবে। মনের কষ্টে কাজী ভাইকে
বললাম কষ্ট করে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং বা এক্সক্লুসিভ আর্টিকেল দিয়ে
পত্রিকা বের করে লাভ নেই। বরং কষ্ট না করে কোন রকমে কাটিং পেষ্টিং করে
পত্রিকা বের করলেও যা চলার তাই চলবে।
কাজী ভাই বললেন ঠিক আছে তুমি আর ডেলিভারিতে যেও না। কিন্তু রিপোর্টিং করা
থেকে বিরত থেকো না। এগুলোর পাঠক আছে এবং থাকবে। কারণ এখন সময় দোকনে যে
পরিমাণ বিক্রি হয় তার কয়েকগুন বেশী প্রতি সপ্তাহে বাৎসরিক গ্রাহদেরকে মেইল
করা হয়। এছাড়া হার্ড কপি ছাড়াও অনলাইনে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৫ হাজার পাঠক
পড়ছেন। ওনার কথা শুনে মনে খানিকটা বল পাই। আর একটি বিষয় জানতে পারলাম যে সব
এলাকায় যেমন এক রকম বিক্রি হয়না আবার সব সংখ্যাও সমান বিক্রি হয়না। এইসব
বিবেচনায় যতটুকু সম্ভব কষ্ট করে তথ্য সমৃদ্ধ করে লেখাগুলো তৈরী করার চেষ্টা
চালিয়েয়ে যাই।
এর মধ্যে এনটিভির হোসেন ভাই একদিন ডাকেন। এ্যাস্টোরিয়ার এনটিভি ভবনে গিয়ে
দেখা করি। হোসেন ভাই বলেন এনটিভির জন্য একটা লোকাল নিউজ করতে হবে।
সহযোগিতার জন্য স্পন্সর করতে রাজী হন ডিজিটাল ওয়ান। প্রসত্দাব লুফে নেই।
কাজী ভাই এবং জাকারীয়া মাসুদ জিকো তাঁরা দুজনই ডিজিটাল ওয়ানের
স্বত্বাধীকারী হওয়ায় তাদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতার ভরসাও ছিল। ডিজিটাল
ওয়ানের স্পন্সরে শুরম্ন হয় এনটিভির প্রবাস সংবাদ।
লেকাল ইভেন্টগুলো নিয়ে সপ্তাহে তিনদিন ১০-১২ মিনিটের বুলেটিন দিয়ে শুরম্ন
করি প্রবাস সংবাদ। এই প্রথম ক্যামেরা তুলে নেই হাতে। এনটিভির চৌকষ
নির্বাহী জামান এবং প্রডিউসার শামীম প্রথমদিন ক্যামেরা চালানোর একটি বেসিক
প্রশিৰন দিয়ে দেন। আবীর আলমগীর যেহেতু আগে থেকেই কমিউনিটির বিভিন্ন
অনুষ্ঠান কভার করতেন প্রবাস নিয়ে তার একটি বুলেটিনের জন্য, তিনি কিভাবে
লোকাল ইভেন্ট কভার করতে হয় তা নিয়ে ছোট্ট একটি ব্রিফিং দেন। শুরম্ন হয়
ফিল্ড লেভেলে কাজ।
প্রবাস সংবাদ প্রথমদিকে সপ্তাহে তিনদিন চালানো হত। সোম, বুধ ওশুক্রবার।
পরবতর্ীতে বুলেটিনের ডিউরেশন বাড়িয়ে সোম ও বুধবার করা হয় যা ্এখনো চলছে।
পাশাপাশি চলছিল এখন সময়ের কাজও। তবে এনটিভির সাথে সাথে নিউইয়র্ক এনটিভি ভবন
থেকে আরো তিন চারটি বাংলা চ্যানেল পরিচালনার কারণে কাজের পরিধি আরো বেড়ে
যাচ্ছে। এখন সময়ের জন্য বরাদ্দকৃত সময় আবারো কাট করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে
চলতে আরো একটি বছরের শেষপ্রানত্দে এসে যাই।
আমার বেলায় এখন সময়ের জন্য কোন বাধাধরা সময় নেই। যখনই সময় হয় সেটাই যেন এখন
সময়ের। আমার সময় যেন এখন সময়ের সময় হতেই চায়না। তারপরও এখন সময়ের নয় বছরের
সময়ের মধ্যে পুরো তিন বছর সময়ই আমার সময়। এখন সময়ের সামনের সময়ও যেন সকলের
সময়ের সাথে আমারও হয় সেই কামনা থাকবে।
হৃদকথন
ফেরদৌস সাজেদীন
এক.
কত কথাই না হারিয়ে যায়। যায় বলেই কথায় কথায়, সে কথারা আর কথকতায় ফিরে আসে
না। শুধু ফিরেই আসে না, তা না সেসব কথাগুলো মহাকালের গর্ভে চিরদিনের জন্য
হারিয়ে যায়।
রোজ রোজ কি ঘুম ভাঙ্গতেই সকালে, বা গাড়ি চালাতে চালাতে, কাজে যেতে যেতে, বা
কাজের মধ্যে, বাড়ি ফিরতে, ঘুমুতে যাবার আগে, চোখের পাতায় ঘুম বসানোর কাজের
মধ্যে বুকের ভেতর থেকে ঠোঁটে এসে কতশত কথা অস্ফুট ফুটে উঠতে চায়, তার কি
কোন হিসেব আছে?
এই অস্ফুটতার মধ্যেই উদিত হয়েছে নতুন ভোর। পৃথিবী এক নতুন বেদীতে দাঁড়িয়ে
উজ্জীবনের গান গাইতে ব্যাকুল হয়ে উঠছে। উষা অতীত সকালে দাঁড়িয়ে এখন নতুন
উষা রচনা করার স্বপ্ন দেখতে পথ খুঁজছে।
ইতিহাস এভাবেই বাঁক তৈরি করে আর এইসব বাঁকগুলোই মানব সভ্যতা ও অগ্রসরতা
নির্মাণ করে। কল্পনা করা যায় ষাটের মধ্যভাগে, গত শতাব্দীর, যা গাঁটছড়া হল,
তা আজ আরেক বাঁকের মুখোমুখি হল! এটাকে কেবল উত্থান বললেই সব বলা হয় না।
মানব সভ্যতার অগ্রসরতা যে ঢেউ-এ ঢেউ-এ আছাড় খাচ্ছে তা বন্যার পানি সরে
যাবার পর পরতের পর পরত পরে যে পলি প্রাণে প্রাণে সরস হয়ে ওঠে সেই পলির উপর,
কর্ষিত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সেই ঢেউ এর আছাড় উদগত মানবসনত্দান, বলছে, ইয়েস উই
ক্যান এবং তা সত্যি বলে পরিণত হয়েছে, অমন কথা বলার কোন ভাষা আছে? না নেই।
বোধের উপর দাঁড়িয়ে কেবল অনুভব করে নেয়া যায়, হয়ত তাও না।
হে মহাকাল, তুমিও কথা কও, কেবল এই-ই অনুভব করি।
ওবামার উত্থান এই মুহূর্তে পৃথিবীর এই সময়ের প্রয়োজনে যথার্থ কারণেই অতি
জরম্নরি হয়ে উঠেছিল। ইতিহাস এবং আমার জীবদ্দশা বলে, আমেরিকার কোন
নির্বাচনের ফলাফলে সারাবিশ্ব নেচে উঠেছে। পৃথিবীর প্রতিটি শহর-গঞ্জে এই
ব্যক্তির আগমন বার্তা পেঁৗছে গিয়েছিল। ২০০৪ সালের ডেমোক্রেটিক কনভেনশনের
'কি-নোট' বক্তা হিসেবে জন কেরী যখন তাকে ডাকে, তখনও তাকে কেউ চেনে না,
তারপর 'ওপরা'র উপযর্ুপরি সহায়তা টিভি অনুষ্ঠান। ওবামা একটি বই লিখেছে, ওপরা
উইনফ্রি তার 'বুক ক্লাবে' বইটিকে স্থান দিয়েছে। মেমোরি ফ্রম মাই ফাদার।
কৃষ্ণাঙ্গ এক হার্ভার্ড গ্রাজুয়েটের লেখা, আত্মজীবনীমূলক বইটি আমি বেশ আগেই
পড়েছি। পড়ে মনে হয়েছিল, তখনই, আত্মজীবনমূলক বইটিকে কখনই মনে হয়নি এটি বারাক
হোসেন ওবামা এর নিজের কথা। যেভাবে এবং যে ভাষায় সে নিজের কথা বলেছে, মনে
হয়েছে এটি একটি উঁচুমানের ফিকশন। আজ এই বিবেচনা করাটাকে অযৌক্তিক বলে
অনুমান পোষণ করছি না যে, ইতিহাসের মহানায়ক, আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ
প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নাও হতে পারত তবুও
একজন বিশিষ্ট লেখক হিসাবে অগুণিত পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারত।
কথায় অমন হৃদয়ে টান আর ক'জনের কথায় হয়! হয় না। যে অনুভবটি প্রায় সকলের সেই
অনুভবটিই কতই না সহজ ও দুঃসাহসিক অনুচ্ছেদ। সহযোগী প্রত্যয়ের সঙ্গে সকলের
কাছে বলতে পেরেছে, দু'বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাকে, তোমাকে সবাইকে একটু হাত
বাড়াতে হবে, কেবল একটু-তাহলেই আমেরিকা তথা মানবজাতির উন্নতি ও দুঃখ কষ্ট
লাঘব অতিসহজ হবে। বলেছে, আমাকে শ্রম ও সমর্থন দাও, আমি তোমাদের সুন্দর জীবন
উপহার দেব। এই স্বাভাবিক ও সহজ একটি অনত্দরমিলনী আর্তি, এটা আমাদের সকলের,
সকল সময়ের। তবুও আমাদের যুগ যুগ ধরে অপেৰা করতে হল একজন ওবামার জন্য, তার
মুখ থেকে এই কথাটি শুনব বলে।
ইতিহাস সুসনত্দান কামনা করে কখনোই ক্লানত্দ হয় না, কেন না ইতহাস জানে,
সুসনত্দান কখন আসবে এবং কী করে আসবে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আমাদের বিগত ৮টি বছরের শাসনামল হয়ত এরকম একটি অলৌকিক
কাহিনীকে বাসত্দবে রূপ দিতেই সহ্য করতে হয়েছে। বুশ সরকার সারা পৃথিবী
ওলটপালট করে দেবে কে ভেবেছিল? কিন্তু ওবামার জন্য যে এই ওলটপালটের ঘনঘটা
একের পর এক ঘটে গেছে আমরা কেউ তা বুঝতে পারিনি। কেবল জানত মহাকাল।
এত উচ্ছ্বাস, একজন কালো আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট-ইলেক্টকে নিয়ে
সত্যিই কী এত আলোড়নের প্রয়োজন আছে? সে তো সরকারের ওয়াশিংটন মঞ্চে কোন
পরীৰিত ব্যসত্দ নয়। তার মেধা ও প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতায় আমরা মুগ্ধ কিন্তু এই-ই
কী সব রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য? আমেরিকার সিংহাসন তো শুধু আমেরিকার নয়, পুরো
পৃথিবীর সিংহাসন। একে সামলানো তো যেমন তেমন ব্যাপার নয়। কত কত সমস্যার
সম্মুখীন ওবামাকে হতে হবে এবং হচ্ছে। হয়ত সময়ের ব্যবধানে এসবের কিছু
সামলাতে সে সৰম হবে, আবার অনেক সমস্যাই সমস্যা থেকে যাবে। তাই বলে যে
ইতিহাস রচিত হল, তা কী পাল্টে যাবে? আমার বিবেচনা এই যে না, পাল্টাবে না।
ইতিহাস সৃষ্ট হয়েছে এই জন্য যে এই প্রথম আমেরিকায় একজন কালো প্রেসিডেন্ট
নির্বাচিত হয়েছে। তার এই নির্বাচনটাই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক বছর।
মানব সভ্যতার জন্য একলাফে আমরা অনেকটুকু পথ অতিক্রম করে ফেলেছি।
যেখানে আমরা সঙ্কর জাতি হয়েও নিদারম্নণভাবে বর্ণবিদ্বেষী সেখানে এই
ওবামা-উত্থান বিরাট ঘটনা। আমরা উপমহাদেশের মানুষ, এখনও বর্ণবাদে আক্রানত্দ
বলেই একটি বাড়নত্দ কালো মেয়ে ঘরে নিয়ে চিনত্দিত থাকি। ছেলের মা সেই কালো
মেয়েকে দেখতে গিয়ে বলে, মুখটা তো দেখতে সুন্দর গায়ের রঙটা একটু ময়লা, তা না
হলে...। বিয়ে হয় না, কালো মেয়েটির। আমাদের চেয়ে বর্ণবিদ্বেষী জাতি আর কটা
আছে?
এরই মধ্যে ওবামা ওবামা। ওবামা তুমি ইতিহাস সৃষ্টি করছে, এবার আমাদের সুসময়
দাও। দেবে না? নিশ্চয়ই দেবে। তুমিতো ওবামা।
দুই.
'এখন সময়' নতুন বছরের জন্মদিনে পা দিল। পত্রিকাটির পেছনে যারা দিনরাত শ্রম
দিয়ে যাচ্ছেন, তাদেরকে অভিনন্দন। এখন সময়ের পাঠক দিনে দিনে আরো বাড়বে, এই
আশা পোষণ করি।
পত্রিকাটির দীর্ঘায়ু কামনা করি। আশা পথকে লম্বা করে, লম্বা পথে সুকীর্তির
সম্ভাবনা বাঁকে বাঁকে অস্থির থাকে। তাই আশাকে আলিঙ্গনে অব্যাহত রাখা
আবশ্যক। আমি 'এখন সময়ের' কর্মকর্তাদের সাধুবাদ জানাই। সবাই ভালো থাকুন,
সুস্থ ও উৎফুলস্ন থাকুন।
সময় ভাবনা
কাজী রাফি শামস্
সময়কে চিন্থিত করার চেষ্টা মানুষের পুরানো। ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ,
অর্থনীতি সব ৰেত্রেই সময়কে বিশেস্নষণ করতে গিয়ে প্রথমেই একে একটি বিশেষ
বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করা হয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে সমাজে যে বিষয়টি
বস্তুগত সম্পদ এবং সেই সূত্রে মানসিক সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে
পেরেছে, সে বিষয়টি সে সময়টির একটা 'ব্র্যান্ড ইমেজ' তৈরিতে প্রধান ভূমিকা
রেখেছে। এভাবে পৃথিবী সৃষ্টির শুরম্ন থেকে সময়গুলোকে কখোনো 'আইস এজ'
পৃথিবীর বুকে মানুষের পদচারনা শুরম্নর সময়কে 'হোমোসিপিয়ন এজ' এভাবে চিহ্নিত
করা থেকে সভ্যতার ক্রমবর্ধমান উৎকর্ষতার সময়গুলোকে 'স্টোন যুগ, ব্রোঞ্জ এজ'
এভাবে চিনতে সমাজবীদ, ইতিহাসবিদরা পছন্দ করেছেন। গত শতাব্দীর তিরিশের দশককে
মন্দার যুগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কে 'সস্নায়ুযুদ্ধের সময়',
সত্তরের দশককে 'মহাকাল যুগ' বা 'স্পেস এজ' বলে বর্ণনা করা এ ধরনের চেষ্টার
ও সাফল্যের আরো কিছু হালকা উদাহরণ।
সত্তরের দশকের শেষ থেকে বিশ্ব একটি পরিবর্তনের দিকে যেতে থাকে। পশ্চিমা
বিশ্বের শিল্পায়ন-উত্তর উৎপাদন প্রক্রিয়ার পুঁজিবাদের খোল নলচে পাল্টে
যাওয়ায় এবং আধুনিকতার দুর্বলতা সমূহকে বিবেচনা করে বিশেস্নষকদের একটি নতুন
যুগের আগমনী বার্তা ঘোষণা করতে উন্মুখ দেখা যায়। সত্তরের দশকে ডানিয়েল বেল
একে বর্ণনা করেন 'পোস্ট ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল সোসাইটি' (শিল্পায়ত-উত্তর সমাজ)
বলে। আশির দশকে জঁ ফ্রাসোয় লিয়োতার কাছে এ সময়টি 'পোস্ট মডার্ন কালচার'
(উত্তর আধুনিক সংস্কৃতি)। পিটার ড্রাকার যুক্তি দেন আমরা আসলে 'পোস্ট
ক্যাপিটালিস্ট', পুঁজিবাদ উত্তর বিশ্বের বাসিন্দা হতে চলেছি। অবশ্য এসব
ভাবনা একাডেমিক চৌহদ্দি অতিক্রমে ব্যর্থ হয়।
নব্বই এর দশকে এসে আমাদের পরিচয় হয় 'গেস্নাবালাইজেশন' বা 'বিশ্বায়ন' ভাবনার
সাথে। যুক্তিটি ছিল পৃথিবীর বাসিন্দারা এখন একে অন্যের সাথে অনেক বেশি
সংযুক্ত। তথ্য ও অর্থ দুইই আগের যে কোন সময়ের চাইতে অনেক দ্রম্নত চলাচলে
সৰম। বিশ্বের এক প্রানত্দের তৈরি পণ্য বা প্রদেয় সেবা এখন অন্য প্রানত্দে
সহজলভ্য। যোগাযোগ ব্যবস্থা আনত্দর্জাতিক পর্যায়ে অতি সহজ ও স্বাভাবিক বিষয়।
এসব কিছুই এক নতুন সময়ের নতুন ধারণার ইঙ্গিত দেয়_ তা হলো বিশ্বায়ন। সময়কে
নিয়ে এই চিনত্দা বা আইডিয়া উপর্যুপরি গবেষণায় সর্বব্যপ্ত রূপ লাভ করে এবং
ক্রমান্বয়ে তা একটি আদর্শ বা আইডলজিতে রূপানত্দর হয় এবং এ সময়ের রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সবটাতেই এই আদর্শ আরোপিত হয়। এ পর্যায়ে
বিশ্বায়ন ভাবনার আদর্শিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় 'বিশ্ববাদ' বা গেস্নাবালইজম।
ইতিহাসের যে সময়টি আমরা এখন পার করছি তা 'বিশ্বায়নের যুগ' হিসেবেই ইতিহাসে
চিহ্নিত হবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলার সময় হয়তো এখনই নয়। কারণ বিশ্বে এখন
আমরা আরো বেশকিছু বিষয়কে ইতিহাসের 'চারিত্র-লৰণ' হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। এর
মধ্রে অন্যতম হলো প্রযুক্তিগত বিপস্নব এবং গণতন্ত্রায়ন। আমরা আরো দেখতে
পাচ্ছি সবৰেত্রেই গণমাধ্যম ও যোগাযোগ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক গণমাধ্যমের বিস্তৃতি এবং এসব মাধ্যমে ভোক্তা
সংস্কৃতির প্রচার ছাড়া অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন সম্ভব হতো না। প্রযুক্তিগত
বিপস্নবের পেছনে রয়েছে ডিজিটাল যোগাযোগ ও কম্পিউটিং-এর অভাবনীয় অগ্রগতি।
প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যের দ্রম্নত প্রচার শাসকগোষ্ঠীর জন্য কোন গোপন
নিপিড়নমূলক ব্যবস্থা অসম্ভব করে তুলেছে, যা গণতন্ত্রায়নের পথে অভূতপূর্ব
উত্তরণ।
বিশ্বায়নের অন্যতম আরেকটিৰণ হলো বিশ্ব বাজার, বাজারের বিশ্বায়ন। ফ্রিডম্যান
অবশ্য স্বীকার করেছেন বাজার বিশ্বায়নের চেষ্টা পুঁজিবাদি আদর্শেরই নতুন
পযর্ায়। ফ্রিডম্যান লিখেছেন যে, বিশ্বায়নের ধারণার পিছনে রয়েছে মার্কেট
ক্যাপিটালিসম। তা যদি হয়, তাহলে অবশ্য বাজারের বিশ্বায়নকে পুঁজিবাদি
ব্যবস্থার পূর্ববর্তী পর্যায়গুলো থেকে আলাদা করার সুযোগ থাকে না। কেননা
বিশ্ববাজার ধারণার এই কথাটি কাল মার্কস ১৮৪০ সালেই উলেস্নখ করেছিলেন যে
'বজর্ুয়ারা প্রত্যেকটি দেশেই উৎপাদন ও ভোগকে বহুজাতিক চরিত্র দিয়েছে এবং
জাতিসমুহের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি করেছে।
ঘটনা যাই হোক, বিশ্ববাদের প্রবক্তারা এমন ধারণা দেবার চেষ্টা করেন যে বাজার
বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়া শুরম্ন হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো আইএফএম এর মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করে
আনত্দর্জাতিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণাধীন করে। এর সুফল হিসেবে পশ্চিমা
দেশগুলো অব্যাহত প্রবৃদ্ধির মুখ দেখতে থাকে। এই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি ছিলো
একদিকে শিল্পোন্নত বিশ্ব অন্যদিকে কাঁচামালের যোগানদার উন্নয়ণশীল দেশগুলো।
এই বিভাজনের আওতায় পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াটি বহুভাগে ভাগ হয়ে যায়। যেখানেই
পুঁজি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে অধিকতর মুনাফা অর্জন করতে পারবে সেখানেই
পণ্য উৎপাদনের জন্য কারখানাগুলো স্থাপন করা হয়। এতে করে অর্থনৈতিক
কর্মকান্ডের আনত্দর্জাতিককরণ ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় অংশিদার প্রত্যেকের মধ্যে
তথ্য বিনিময় এক জরম্নরি বিষয় পরিণত হয়। সিদ্ধানত্দ গ্রহণ, বাসত্দবায়ন,
কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন-প্রত্যেকটি অংশের সার্বৰনিক যোগাযোগই এই পদ্ধতিকে
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
গেস্নাবালাইজেমের প্রবক্তরা এটা স্পষ্ট করেছেন যে গেস্নাবালইজম বোঝার জন্য
আমাদের অবশ্যই এই যোগাযোগের দিকে নজর দিতে হবে। তাদের এই বক্তব্য খুবই
সত্য। উন্নত বা উন্নয়নশীল যে কোন দেশের সাধারণ একজন নাগরীককে যদি প্রশ্ন
করা হয়, এই সময়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য কি, তারা একবাক্যে জবাব দেবেন
সহজে ও স্বল্পতম সময়ে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করার সুবিধা। বিশ্বায়নের এই
যোগাযোগ নির্ভরতা বিশ্বায়ন সম্পর্কে চলতি ধারণাকে একটু একটু করে বদলে
দিচ্ছে এবং নতুন একটি ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইন্টারনেটকে সামনে এনে ভাবলে
একটা উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে। ইন্টারনেট একদিকে যেমন গণমাধ্যম হিসেবে সমাজে
নতুন মাত্রা যোগ করেছে আবার অন্যদিকে আনত্দর্জাতিক যোগাযোগের ধারণাটিও বদলে
দিয়েছে। যোগাযোগের এই নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি আমাদের আত্ম পরিচয়ের নতুন
ধারণারও জন্ম দিচ্ছে। আনত্দর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো, বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক
কাঠামোকে বদলে দিতে চাইছে। প্রযুক্তি তথ্যের আদান প্রদানকে নতুন রূপ
দিয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সর্বত্রই সম্পর্কের কারণে যোগাযোগ না_
যোগাযোগই সম্পর্ক সৃষ্টি করছে। তাই গেস্নাবালইজম তথ্য ও যোগাযোগ
প্রযুক্তিকে বিস্তৃত করেছে, নাকি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি গেস্নাবালইজমকে
একটা নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে চাইছে তা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি।
ইতিহাসবিদরা সময় চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় এই সময়টিকে কিভাবে চিহ্নিত করেন
তা দেখার জন্য আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম রইলো।
২.
কিছুদিন আগে ঢাকার একটি টিভি চ্যানেলে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাব নিয়ে একটি
আলোচনা অনুষ্ঠানে অর্তনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলছিলেন, বিশ্ব
অর্থনীতির এই অবস্থাটি মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে কিনা তা বলার সময় এখনো
আসেনি। কথাটি বলার সময় তার মুখের মুচকি হাসি তার বক্তব্যকে আরো অর্থবহ করে
তুলছিল।
এটা ঠিক কিছু কিছু ঘটনা আসলেই ঘটেছে কিনা তার জন্য আমাদের অপেৰা করতে হয়।
একটি ঘোষণার জন্য। যদি ঘটনাটি ঘটতে ঘোষণার অপেৰা করে না গুঁড়ো দুধে মেলামিন
আছে কিনা, মেলামিন বিষ কিনা সেটি জানাতে মিডিয়াগুলো সরকারের অফিশিয়াল
ঘোষণার অপেৰা করলেও বিষক্রিয়া আপনার শিশুর জীবন কেড়ে নিতে কোন অফিশিয়াল
ঘোষণার অপেৰা করে না।
সময়ের ৰেত্রেও, তা সুসময় না দুঃসময় জানার জন্য, বলার জন্য আমাদের অপেৰা
করতে হয়।
৩.
এখন সময় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়ে আসছে গত ৮ বছর যাবৎ। ৮ বছর ধরে 'এখন সময়'
নাম নিয়ে সময়কে চিহ্নিত করার তার এই প্রচেষ্টা নিউইয়র্ক এর বাংলা মিডিয়ায়
একটি ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে বলে নিউইয়র্ক ও বাংলাদেশর মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা
মনে করেছেন বলে জেনেছি। কিন্তু পত্রিকাটির ঢাকা প্রতিনিধি হয়ে শুরম্ন থেকে
কাজ করেও আমার কাছে এমন মনে হয়নি। নিজেকে আমার কাছে সেই মিথ্যেবাদি রাখাল
মনে হয়েছে যে প্রতিদিন 'বাঘ আসছে বাঘ আসছে' বলে চিৎকার করে মানুষের কাছে
কেবলই মিথ্যাবাদী হিসেবে ধিক্কার পেয়েছিল। একদিন যখন বাঘ আসলো তখনও সেই
বালককে কেউ সতর্ককারী বালক হিসেবে চিহ্নিত করেনি।
৮ বছর ধরে আমরা কোন সময়ের কথা বলে যাচ্ছি? কেন বলে যাচ্ছি? কাদের বলে
যাচ্ছি?
নিউইয়র্কে ১ ডলার দিয়েএকটি পত্রিকা কারা কেনেন এই মন্দার বাজারে তা আমরা
জানি না। জানতে ইচ্ছে হতোও না যদি না আমরা দেখতাম যে একই শহর থেকে প্রকাশিত
একই রকম দেখতে আরো কিছু পত্রিকা যার কোন কোনটি ফ্রি। আমরা নিম্ন আয়ের দেশের
মানুষরা উচ্চ আয়ের দেশে গিয়েছি টাকা কামাতে, আমাদের জন্যতো ফ্রি'ই ভালো, এক
ডলার দিয়ে কেন পত্রিকা কেনা? এম চিনত্দা আসাটাই স্বাভাবিক ছিলো। আমাদের এটা
দেখেও মন খারাপ হয় যে ঐসব ফ্রি পত্রিকাগুলোর 'ঢাকা বু্যরো অফিস' থাক না
থাক, সেগুলোর ঢাকা লবিং বেশ সমৃদ্ধ। জনপ্রিয় লেখক সাংবাদিকরা ঐসব ফ্রি
পত্রিকার কোন কোনটির নাম শুনে বেশ আহ্লাদিত হন। আর আমাকে একটু শুভেচ্ছা
বাণী আনতে তাদের ব্যাজার মুখের সামনে ঘন্টাব্দি বসে থাকতে হয়। আমরা বিমর্ষ
হই, কিন্তু নিউইয়র্ক ডেস্ক আমাদের উৎসাহ দিয়ে যায়, তাদের বাজার উত্তোরত্তর
ভালো হচ্ছে বলে। আমরা উদ্যেমে কাজ করে যাই এখন সময়ে। যেমন করেছি তখন সময়ে।
তখন সময়টা ছিল কঠিন। ইন্টারনেট তখন প্রতি মিনিটে দেড় টাকা করে কাটছে সেই
জ্বালায় আমরা জ্বলতাম। স্পিডের বিষয়টা তখন বুঝতামই না। আর ছিল ল্যান্ড ফোন
লাইনটিকে ব্যসত্দ রাখা কারণে অফিসের অন্য সবার বিরক্তি। এখন অফিসে ৩টি
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। কিন্তু ল্যান্ডফোনে ধুলো জমে থাকে সবসময়। তখন
সিদ্বেশ্বরী (আমার বাসা) থেকে পল্টন (এখন সময়, ঢাকা অফিস) এর রিকশা ভাড়া
ছিল আট থেকে দশ টাকা। এখন ৩০ টাকা । সময় এখন অনেক সহজ।
৪.
৮ বছরে বন্ধু পেয়েছি অনেক। একটা বিষয় মনে হয় নিউইয়র্ক লেখক, সাংবাদিক,
পাঠকরা উপলব্ধি করতে পারবেন না যে ওখানে আপনাদের যেমন একটি 'মিডিয়া
কমিউনিটি' আছে, আমাদের ঢাকায় সেটা নেই। রাজধানীতে কাজ করেও আমরা এ দেশের
মিডিয়া এবং মিডিয়া পারসনদের কাছে অনেকটা অচ্ছুৎ। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
সহযোগী সাপ্তাহিকগুলোর ঢাকা অফিসের সাথে তেমন একটা যোগাযোগ আমাদের তখনো ছিল
না, এখনও নেই। এই পিড়াদায়ক একাকিত্ব কিছু আমাদের পুরো টিমকে বিচ্ছিন্নতায়
ডুবিয়ে রাখতো। যোগাযোগহীনতা এই অচলায়তন ভেঙেছিলেন 'বাংলা পত্রিকা'র হাসান
ভাই। শুরম্নর দিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে তিনি আমাদের এক ধাপ এগিয়ে
দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাদের আরেক সহযোগি প্রতিষ্ঠান নিউজ ওয়ার্ল্ডের শফিক
এখন সময়ে কিংবদনত্দিকতুল্য অবদান রেখেছে।
আরেকজনের কথা বলব আজ।
আহসান পলকের সাথে আমার প্রথমবার দেখা হয় ধানমন্ডি লেকে। ২০০৩ এর নভেম্বরের
কোন এক সন্ধ্যায়। অফিস ছুটির পর আমরা পুরোনো বন্ধুরা আড্ডা দিতাম সেখানে।
সেদিন আমি একটু আগেই পেঁৗছেছিলাম। দেখলাম আমাদের আড্ডাস্থলের একটু দূরে
একটি ছেলে বসে আছে একা। তার হাতের পত্রিকাটি আমি দূর থেকে দেখেও চিনতে
পারলাম, 'সাপ্তাহিক ঠিকানা'। আমার জানা ছিল ঠিকানা নিউইয়র্কের সবচেয়ে
পুরোনো সাপ্তাহিক। আমি এগিয়ে গেলাম, মৃদ হেঁসে চাইলাম পত্রিকাটি। এভাবে
পরিচিত হলাম তার সাথে, পলক সাপ্তাহিক ঠিকানা, দর্পণ ও বার্তা সংস্থা এনার
স্টাফ রিপোর্টার। পলকের কাছে কখনো আমি এমন কোন সহযোগিতা চাইনি যেটা বাংলা
পত্রিকার হাসান বা শফিক নুর করতো। কোনো সময় পত্রিকার কোন বিষয় নিয়ে তাকে কল
করতে চেয়েও কেন জানি করা হয়নি। হয়তো এমন সামান্য "স্বার্থসংশিস্নষ্ট" বিষয়
নিয়ে তাকে নক করতে ইচ্ছা হয়নি_ বন্ধুত্বকে খাটো করার ভয়ে। ধানমন্ডি লেকের
পাড়ে দেখা সাৰাতেই থেমে ছিল পলকের সাথে আমার যোগাযোগ।
এরমধ্যে হঠাৎ করেই আমাকে ঢাকার বাইরে থাকতে হয় প্রায় বছর দুয়েক। ধানমন্ডি
লেকের আড্ডাবাজ সেইসব বন্ধুরাও ততদিন আরো বেশি ব্যসত্দ হয়ে গেছে। পলককে
প্রায় ভুলেই গেছিলাম। এখন সময়ের দায়িত্বভারও অনেক হালকা হয়ে এসেছে। একদিন
বিকেলে ধানমন্ডি লেকে বেড়াতে যেয়ে মনো পরলো পলকের কথা। আহসান পলককে
প্রথমবার কল করে আমি একটা ধাক্কা খেলাম। একটি মেয়ে ফোন ধরে জানায়, সে পলকের
বোন এবং পলক 'মারা গেছে'। ঘটনা বুঝতে আমার অনেক সময় লাগলো। কেমন করে হয়
এটা! আমি মানতে পারি না। পলকের বোন লোপা আমাকে প্রথমবারের চেয়ে আরো সহজ
কণ্ঠে জানায় তার ভাইয়া স্ট্রোক করে মারা গেছে। ঠিকানার অফিসেই, ২০০৬ এর ১
নভেম্বর। লোপা আরো জানায়, সে মাসেরই ৭ তারিখ পলকের বিয়ের কথা ছিল-শানত্দার
সাথে। শানত্দা আর বিয়েই করেনি।
পলককে আমি ভুলতে পারি না। পলকের স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কেন জানি না।
পলকের অসময়ে চলে যাওয়া সময়-অসময়ের প্রচলিত ধারণা নিয়ে আমার মধ্যে
বিভ্রানত্দি তৈরি করে।
এখন সময়ে যখনই কাজ কতে আসি, আমি যেন পলকের কাছে আসি বা পলককে সাথে নিয়ে
আসি। আমি বুঝতে পারি, পলকের স্মৃতি আমাকে এভাবেই তাড়িয়ে বেড়াবে, কোন কারণ
ছাড়াই। যতদিন অনত্দত নিউইয়র্ক থেকে বাংলা পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হতে থাকবে।
সংকট নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে প্রিন্ট মিডিয়া
ফারহানা চৌধুরী
দেখতে দেখতে এখন সময়'র বয়স ৯ বছর। বলতে গেলে নিরবে সময় চলে যাচ্ছে। সময়ের
সাথে সাথে তাল রেখে এখন সময় সব সময়ই সময়োপযোগী। বিগত বছরগুলোতে 'এখন সময়'
মান বজায় রেখে এগিয়ে আছে পাঠকের বিচারে।
নিউইয়র্কে বাংলা প্রিন্ট মিডিয়া একটা সংকটকাল অতিক্রম করছে। টেলিভিশন
ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে তো আছেই- এছাড়াও আরো বহু অবাঞ্চিত সমস্যারও
মোকাবেলা করতে হচ্ছে প্রিন্টমিডিয়াকে। অনেকে বলেন পত্রিকার সংখ্যা বেড়েছে।
আমার দৃষ্টিতে সুস্থ্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পত্রিকার সংখ্যা বাড়লে সমস্যা
হবেনা। সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন কোন শিল্প অসুস্থ্য প্রতিযোগিতার সম্মুখিন হয়।
পত্রিকার তুলনায় টেলিভিশনগুলো এখনো সুস্থ্য অবস্থায় আছে। এই পর্যনত্দ
আমেরিকায় ডিশ নেটওয়ার্কে এনটিভি, এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই- সমপ্রতি যোগ
হয়েছে আর টিভি, আরো যোগ হবে বাংলা ভিশন ও একুশে টিভি। শোনা যাচ্ছে চ্যানেল
ওয়ান ও ইসলামিক টিভিও ডিসে আসছে। এভাবে ডিসের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় বাংলা আট
থেকে দশটি বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল। বাংলা
প্রিন্ট মিডিয়ার মত টেলিভিশনগুলোর কোন সংকট এখনো নেই। সংকটে পড়ুক এমন
আশংকাও হয়ত কেউ করে না। কিন্তু আবার্চিন মানসিকতার কারণে কেউ এমনটি করে
বসলে টেলিভিশন মিডিয়া ও আমেরিকায় গ্রাহক ও বিজ্ঞাপনের বাজারে অসম
প্রতিযোগিতায় তারাও ৰতিগ্রসত্দ হবে। তখন গোটা বাংলা মিডিয়াই গোড়াতেই হোচট
খাবে।
আমেরিকায় আমাদের বাংলাদেশী কমু্যনিটি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এখানে আমাদের লৰ্য- নিজেকে, দেশের সুনামকে ও নিজেদের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা
করা। এইজন্য প্রথমিক অবস্থায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মতা একানত্দভাবে
আবশ্যক। একটি সমাজ পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া উন্নতি করতে পারেনা।
প্রতিযোগিতা থাকবে মান উন্নয়ন ও উৎকর্ষতার, পরশ্রীকাতরতা ও প্রতিহিংসার নয়।
ব্যক্তিমান উন্নয়ন হলে- উন্নত ব্যক্তির মাধ্যমে উন্নত সমাজ গড়ে উঠবে। আর সে
সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিই হবেন বিকশিত।
বাঙ্গালী সারা বিশ্বে উৎকর্ষের সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু আমেরিকায় শুধু
উৎকর্ষ ও আত্মবিকাশই নয়, এখানে আরো অর্থবহভারে নিজেদেরকে একটি অভিবাসী
সমপ্রদায় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ আছে। আমেরিকায় উপেৰিত অভিবাসী কালো
সমপ্রদায় (আফ্রো-আমেরিকান) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। যা কেউ একদিন
স্বপ্নেও ভাবেনি। এশিয়ানরা আমেরিকান প্রশাসনে উলেস্নখযোগ্য পজিশনে।
রাজনীতিতেও সিড়ি ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছি আমরা বাঙ্গালীরাও। আমাদের
প্রতিযোগিতার লৰ্য থাকবে সবাই মিলে উপরে উঠার। কাউকে টেনে নামানোর নয়।
প্রসঙ্গত এসব কথা এসে গেল এখন সময়'র বর্ষ শুরম্নতে। আমরা পত্রিকা প্রকাশ
করতে গিয়ে নাতিদীর্ঘ পথ অতিক্রমে বহু ধরনের অভিজ্ঞতা পেয়েছি। অনুমান করতে
পারি অন্যান্য সহযোগিদের অবস্থাও তাঁরা ভালো আছেন, ভালো নেই। আমাদের চেয়ে
ভালো আছেন এটা আমরা মনে করি। তবে ভালো হবে যদি সবাই মিলে মিশে ভাল থাকি।
জনসংখ্যার চাপে, অভাবে, বন্যা জলোচ্ছাস, দৈর দুর্বিপাকে জর্জরিত দেশের
মানুষ- আমরা টাকা গুনতে গুনতে ডলারের দেশে এসেছি। দেশে যারা সচ্ছল ছিলাম
তারা এসেছি জমি জিরাত বিক্রি করে। অসচ্ছলরা এসেছি ধারদেনা করে, শিৰিতরা
এসেছি বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকুরীর প্রতিষ্ঠানে বন্ড দিয়ে উচ্চ শিৰার জন্য,
অর্ধশিৰিতরা এসেছি আরো শিৰা নিতে, কেউ এসেছি ডলারের স্বপ্ন নিয়ে আবার কেউ
ভাগ্য লটারী জিতে। আর সবাই মিলে এসেছি উন্নত জীবন গড়ার 'আমেরিকান স্বপ্ন'
ঘোরে। কিন্তু ভোর না হতেই ঘোর কাটার আগেই যদি শুরম্ন হয় স্বপ্ন ভঙ্গের আর
ভাঙ্গার মারামারি তা হলে-----
দুনিয়ার মানুষের কাছে মিডিয়ার মর্যাদা আছে, চিরদিন থাকবে। তাই সমাজ গড়ায়
মিডিয়া ভুমিকা পালন করতে পারে এবং পালন করবে এই বিস্বাশ পাঠক, সাধারণ
পেশাজীবি, বুদ্ধিজীবি, শিৰক লেখক সবার। আমরা তাঁদের কথা শিরধার্য করে
অনুসরণের চেষ্টা করে আসছি। ৯ বছরের শুরম্নতে প্রতিবারের মত সংশিস্নষ্ট
সকলকে এই প্রতিশ্রম্নতিও দিচ্ছি। যত বাধা প্রতিকূলতাই আসুক- এখন সময় মহান
আলস্নাহর উপর ভরসা রাখার কারণে সব বাধা বিপত্তি তুচ্ছ মনে করে। আমাদের
বৈশিষ্ট্য ও সাহসের উৎস এখানেই।
আমাদের সম্মানিত পাঠক পৃষ্টপোষক ও বিজ্ঞাপন দাতাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা
যদি মনে করেন এখন সময় সঠিক ভুমিকা পালন করছে তা হলে আপনাদের সহযোগিতা দিয়ে
এই প্রতিষ্ঠানটিকে টিকে থাকতে আপনারাও ভুমিকা রাখুন। মহত কিছু প্রতিষ্ঠা
করতে যে বড় ত্যাগের প্রয়োজন এখন সময় তা প্রমাণ করেছে। এখন পাঠক
পৃষ্ঠপোষকদের দায়।
*ম্যানেজার এখন সময়
একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রাত
শেখ
সিরাজুল ইসলাম
মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েও সেদিন কাজে যেতে হয়েছিল। কারণ পরদিন পত্রিকা বের
হবে। আর তাছাড়া মাতো অসুস্থ বাংলাদেশের এখানে নয়। সুতরাং কিছু করারও তো
নেই।
কয়েকদিন ধরেই ঘন ঘন ফোন করে মা'র সর্বশেষ পরিস্থিতি জানছিলাম। তবে কোন ভাল
সংবাদ পাচ্ছিলাম না।
খাট থেকে পড়ে গিয়ে মা আমার পা ভাঙলেন। সেই চিকিৎসার জন্যই ছোট কোন নার্সিং
হোমে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
পা মোটামুটি ভাল হলেও নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠে ঘা হয়ে
গিয়েছিল। সেটার অবস্থা ভালোর দিকে হলেও নার্সিং হোমের ঠান্ডায় নিমোনিয়া হয়ে
গেল তার।
নার্সিং হোম থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হলেও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে আবারও
ফিরিয়ে নিতে হল তাকে।
সন্ধ্যায় যথারীতি এখন সময় পত্রিকায় চলে এলাম। বরাবরের মত কাজী ভাই, মনজুর
ভাইকে সালাম দিয়ে দু'চার কথা বলে শুরম্ন করলাম কাজ। সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন
সংবাদের সাথে পরিচিত হতে হতে কখন রাত দুপুর হয়েছে টের পাইনি। নিউজের খুব যে
একটা চাপ ছিল তা নয়, তবে সপ্তাহের কোন ঘটনা যেন বাদ না যায় সেদিকে অবশ্যই
লৰ্য রাখতে হত।
বিশেষ করে সম্পাদক কাজী ভাই ও সহযোগী সম্পাদক মনজুর আহমেদের সুদৃষ্টি
সুনজর। অপরদিকে আমার আগ্রহ পত্রিকায় কাজের শেষেও আমি এখন সময়ের টেবিলে একটু
সময় কাটাতাম।
রাত যত গভীর হত বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের সংবাদের পিছনে পিছনে আমি ছুটতাম। এ
কারণে রাত আরো গভীর হত।
মাঝে মাঝে কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিজাইনার পাপিয়া ভাবীর টিকা-টিপ্পনি
আমাদেরকে প্রাণবনত্দ করে রাখত। চোখভরে ঘুম নেমে আসলেও ঘুমানো আর হয়ে উঠত
না।
অন্যান্য দিন মধ্যরাতের কিছুৰণ পর পাপিয়া ভাবী তার কাজ গুটিয়ে বাসার দিকে
রওয়ানা দিতেন। আমিও কিছুদূর পথ তার পিছু নিতাম। বাসার সামনে গেলেই আবার
অফিসমুখী হতাম।
রাতের কাজের ফাঁকে কয়েকটা পথ হেঁটে আবার অফিসে ফিরে কাজ করতে ভাল লাগত।
সেদিন কাজ শেষ করতে পাপিয়া ভাবীর একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমিও অন্যঘরে গিয়ে
বারবার দেশে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম।
হঠাৎ টেলিফোনের সংযোগ ঘটল। অপরপ্রানত্দ থেকে টেলিফোন উঠানো মাত্রই চিৎকার,
কান্না আর চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতেই বুঝতে আর বাকি রইল না।
আমার কণ্ঠ শুনতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আমার বোন, ভাই এবং বাড়ির অন্যান্য
আত্মীয়-স্বজন।
আমি অনেক কষ্ট করে নিজের কান্না বুকে চেপে ধরে রেখে ওদেরকে মিথ্যা
সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম। একসময় শুধু জিজ্ঞেস করলাম 'কখন'? বলল সকালে।
বড় ভাই শুধু জেনে নিল, আমি দেশে ফিরব কি না। আমার 'না' সূচক জবাব পেয়ে তিনি
বললেন-আমরা মা'র জানাজার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারা গোসলে অংশ নিয়েছে তাও
তারা জানালেন। আমি আর বিশেষ কিছু বলতে পারিনি।
বুক ফেটে কান্না আসছিল। কিন্তু পারছিলাম না। শুধু গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা
অশ্রম্ন দু'দিক দিয়ে বেয়ে পড়ছিল।
একসময় অন্য রম্নম থেকে পাপিয়া ভাবীর ডাক পড়ল। কাউকে কিছু না জানিয়ে বললাম
চলেন আপনাকে পেঁৗছে দিয়ে আসি।
বলেই দু'জনে বেরিয়ে পড়লাম। পাপিয়া ভাবীর বাড়ির সামনে আসতেই আমি বললাম ভাবী
জানেন, আজকে আমার আম্মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
পাপিয়া ভাবী হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। বললেন বলেন কি? আমি বললাম হঁ্যা, এইমাত্র
খবর পেলাম।
উনি বললেন, আপনি তাড়াতাড়ি বাসায় যান। তবে খবরদার গাড়ি চালিয়ে যাবেন না। আমি
বললাম ভাবী আপনি কোন চিনত্দা করবেন না। আমি ঠিক আছি। উনি পুনরায় কিছু বলার
আগেই তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার অফিসে এলাম।
অফিসে ঢুকতেই মনজুর ভাই আমাকে বললেন, সিরাজ সাহেব আপনি জলদি বাসায় যান।
আপনার ওয়াইফ ফোন করেছিল।
আমি বললাম আমি খবর পেয়েছি। উনি বললেন-আপনি খবর পেয়েছেন কখন? আমি বললাম এইতো
কিছুৰণ আগে।
উনি একটু অবাক হলেন। আমার ভাবলেশহীন দেখে।
কাজী ভাই এগিয়ে এসে বললেন বাসায় চলে যান। তাদের কেউ সাথে যাবেন কিনা
জিজ্ঞাসাও করলেন।
আমি তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।
গাড়িতে বসে গাড়ি গরম করছিলাম আর ভাবছিলাম _
কি বিদেশে এলাম। না পারলাম দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে। না পারলাম মা'র
জন্য কিছু করতে। আর এই বিদেশে আমরা কত অসহায়।
বিশেষ করে সংবাদপত্রসেবীদের এরকমই বোধ হয়। কত মানুষের দুঃখের কাহিনী তারা
ছাপে, লেখে অথচ নিজেদের দুঃখের কথা কাউক বলতে পারে না। এটাই বোধ হয় অলিখিত
নিয়ম।
আমি ও এখন সময়
নিহার সিদ্দীকী
আমার আশা যাওয়ার পথেই ছিল ডিজিটাল ওয়ান। একদিন ঢুকতেই চোখাচোখি হল কাজী
ভাইর সাথে। সালাম বিনিময়ের পরই আমার পরিচয় দিলাম। আমি একজন ফটো সাংবাদিক
এবং ইত্তেফাকে কাজ করেছি জেনে তিনি খুব আগ্রহ নিয়েই কথা বললেন। এরপর থেকে
প্রায় প্রতিদিনই ৬৪ স্ট্রিট উডসাইডের সেলফোন দোকান ডিজিটাল ওয়ান-এ আমার আসা
হতো। একদিন কাজী ভাই আমাকে একটি বীপার নেয়ার কথা বললেন। কারণ আমার সাথে
প্রয়োজনে যোগাযোগ করার জন্য। তখন অবশ্য সেলুলার ফোনের প্রচলন তেমনটি হয়নি।
আমিও প্রয়োজনীয়তা মনে করলাম। কারণ এর ফলে আমার পেশার কাজ পেতেও সুবিধে হবে
মনে করে। তাছাড়া নতুন এসেছি বলে সেলুলার ফোন নেয়াটা সহজও ছিল না। পরে অবশ্য
একটি সেলফোনও নিয়েছিলাম। আর আজো আমি একই ফোন নম্বরটি ব্যবহার করছি।
এখন সময় প্রকাশিত হল ২০০০ সালের প্রথমে মাসিক ম্যাগাজিন হিসেবে। শুরম্ন
থেকেই আমি আছি। তখন বুঝতে পারলাম কাজী ভাই আমাকে টার্গেট করেছিলেন পরিচয়ের
পর থেকেই। প্রথমে সাপ্তাহিক আকারে এখন সময় প্রকাশিত হতে শুরম্ন করলো। তখন
আমার ওপর নিয়মিত চাপ। সপ্তাহে একটি ছবি দিতেই হবে। শীলু আপা ছিলেন এখন
সময়-এ। তিনি নিজেই আগ্রহ করে ক্যাপশন লিখতেন। এখন সময়-এর কুইন্সের অফিসটি
তখন আমার বৈকালিক আড্ডায় পরিণত হল। ড. আসিফ নজরম্নল ভাই, শীলু আপা দীপা,
সজীব, মাহবুব ভাই, শাহরীরয়ার ভাই সবাই মিলে একটা ভিন্ন পরিবেশ। কম্পোজ
সেকশনে তখন যারা ছিলেন তাদের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।
সে সময়ে এত সংগঠনও ছিল না। তবে শিল্পী সাহিত্যিক কেউ না কেউ প্রতিদিন
আসতেন। আড্ডা চলতো, সাথে ডানকিন ডোনাটের কফি। আবার কোন দিন কেউ বাসা থেকে
নিয়ে আসতেন চটপটি, পিঠা। সেই থেকে আমার এখন সময়। এখনো আমার এখন সময়। দিনে
দিনে কাজের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আমাকে প্রচুর ব্যসত্দ থাকতে হয়। ছবি তোলা,
ভিডিও করা নিয়ে। এটা আমার পেশা। সব কিছুর পরও আমার ছবি ছাড়া এখন সময় ছাপা
হবে- না এটা আমি যেমন চিনত্দা করি না। কাজী ভাইও করেন না। বেশিরভাগ সময়ই
ছবির ক্যাপশনে আমার নাম থাকে না। ঢাকার পত্রিকায় কাজ করে আসায় পত্রিকা
কর্তৃপৰের এই অনিচ্ছাকৃত পরিস্থিতিটি আমি বুঝি। কিন্তু আমার পাঠক? হঁ্যা
আমার ছবির পাঠক! এখন সময়-এর নিয়মিত পাঠকের মধ্যে আমার ছবির পাঠকও শামিল।
তারা আমাকে দেখা হলে বা ফোনে বলেন আপনার ঐ ছবিটি...। আমার আনন্দ ও প্রাপ্তি
সেখানেই। অনাগত দিনেও আমি থাকবো এখন সময়'র সঙ্গে।
নিঃসঙ্গতা থেকে শখের সাংবাদিকতায়
আবদুস্ সাত্তার
ছোটবেলা থেকেই পত্রিকা পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল। বাবা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য
ছিলেন। তিনি যখনই শহরে যেতেন আসার সময় দু'একটি পত্রিকা নিয়ে আসতেন। আর আমি
ফাঁকে ফাঁকে সেগুলো পড়ার সুযোগ করে নিতাম। তারপর চলে গেলাম চাঁদপুর সরকারি
কলেজে। সেখান থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি। সময়টা কাটতো পেপার পড়া, ম্যাগাজিন
পড়া আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ায়। এরই মাঝে আমার গ্রামের বাবুল সৌদি থেকে
ফোনে বললেন অফিসে কাজের ভিসা আছে সৌদি চলে আস। বাবা-মাকে বললাম তাঁরা
কিছুতেই সায় দিলেন না। কিন্তু আমার যে মাথায় ভূত চেপেছে বিদেশে যাবো।
অগত্যা বাবা মা টাকা পয়সা জোগাড় করে দিলেন এবং অফিসে জমা দিলাম। ভিসা হয়ে
গেল। ১৫ মে ১৯৯৮ চলে গোলাম সৌদি আরবের জেদ্দা এয়ারপোর্টে। কোম্পানির গাড়ি
দিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে গেল। রাতে আরো তিনজন বাংলাদেশীর সাথে থাকতে দিল। এক
রম্নমে চারজন থাকতে হবে। ভোর ৫টা পর্যনত্দ আমি বিভোর ঘুমে। পাশের বেডের লোক
আমাকে ডেকে বলছে এই যে ভাই উঠুন কেন্টিনে গিয়ে নাসত্দা করতে হবে ৬টার
মধ্যে। তারপর কাজে যেতে হবে। ৬টার পরে গেলে কোন নাসত্দা পাবেন না। তড়িঘড়ি
করে তৈরি হয়ে কেন্টিনে চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি প্রায় ২০০০ বাংলাদেশী
নাসত্দা করছে। ওই নাসত্দার টেবিলে বসে দেশের রাজনৈতিক আলোচনা,
স্ত্রী-প্রেমিকা-বন্ধুসহ দুনিয়ার কথা নিয়ে ব্যসত্দ। ঠিক সেই সময়টায় মনে
হচ্ছিল ওরা সবাই মধুর কেন্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। নাসত্দা শেষে সবাই চলে
গেল যে যার গাড়িতে করে কাজে। আমরা গতকাল যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি সবাই
দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুৰণ পর মুদির (সুপারভাইজার) আমাদেরকে একটি বাসে করে নিয়ে
গেল। মরম্নভূমির মধ্য দিয়ে ২০ কিঃ মিঃ দূরে। বাস থামলো। চারদিকে শুধু পাহাড়
আর উত্তপ্ত বালু, কোন ঘর বাড়ির চিহ্ন নেই। মুদির বললো এখানেই ১০ তালা ৫টি
বিল্ডিং হবে। সবাই কাজে লেগে গেল, কেউ বসার জন্য জায়গা বানাচ্ছে। আর আমি
কাঠের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ভাবছি। সকালে কাজে আসব প্রথম দিন। তাই ভালো জামা,
জুতা, প্যান্ট, হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি কলম। আমার কাজ অফিসে তাই একটু
বাড়তি সাজা। অনেকৰণ দাঁড়িয়ে থেকে আর পারছিলাম না, তাই এক টুকরা পাথর টেনে
বসে পড়লাম আর অমনি করে ভাবনার জগত থেকে এক ফোঁটা দুফোঁটা করে চোখের পানি
পড়তে শুরম্ন করল। মুদির আমার কাছে এসে বলল 'হাউ আর ইউ'।
বললাম আমি অফিসের ভিসা নিয়ে এসেছি। আর এখন দেখি কনস্ট্রাকশন কাজ।
সুপারভাইজার খুব ভালো ছিল। তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন তুমি কান্না কর না।
আমাদের কোম্পানি অনেক বড় তোমাকে সকালেই অফিসে পাঠিয়ে দিব। ঐ দিনটা অনেক
কষ্টে কাটিয়ে দিলাম। সকালে অফিসের গাড়ির জন্য অপেৰা করলাম। তারপর হযরত আলী
ভাই আমাকে অফিসের গাড়িতে করে নিয়ে যায়। অফিসে আমাকে ইন্টারভিউ নেয়া হয়।
আমাকে অফিসের কাজই দেয়া হল।
তারপর থেকেই রোববার থেকে বৃহস্পতিবার অফিস। শুক্র, শনি ছুটি। প্রবাস জীবন
যে কি যন্ত্রণা, একাকিত্ব, যারা একা থাকেন শুধু তারাই উপলব্ধি করতে পারেন।
আর আমার ঠিক তাই হয়েছিল। কোথায় সেই বিষ্ণুপুরের বৈশাখী ক্লাব, চাঁদপুর
ষোলঘর এবং ঢাকার শ্যামলী সিনেমা হলের সামনের সেই আড্ডা-সবই যেন এলোমেলো হয়ে
গেল। আমার এই একাকিত্ব-নিঃসঙ্গতা দূর করতে শুরম্ন করলাম সাপ্তাহিক
চিত্রবাংলার প্রবাস কলামে লিখে। লেখাগুলো ছাপতে শুরম্ন করলো। আনন্দও পেতে
থাকলাম। এভাবেই কেটে গেল কয়েকটি বছর। আমি যেই কোম্পানিতে চাকরি করি সেই
কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্য আমেরিকার সাথে জড়িত। আমার বস্ আমাকে বলে তুমি কেন
আমেরিকা থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে আস না। তাহলে তোমাকে আরো ভালো চাকরি দিব।
কথা শুনে মনে মনে খুশি হলাম। তারপর ঋষড়ৎরফধ টহরাবৎংরঃু তে অপপড়ঁহঃরহম ধহফ
ইঁংরহবংং-এ পড়ার জন্য আবেদন করলাম। ইউনিভার্সিটি কাগজপত্র তৈরি করে ভিসার
জন্য অ্যাম্বাসিতে পাঠিয়ে দিল এবং আমাকে চিঠি দিল পাঁচ ডলার লাগবে।
উবঢ়ড়ংরবঃ এবং আমেরিকা থাকে এমন কাউকে জিম্মাদার হতে হবে। চিনত্দায় পড়ে
গেলাম। আমি জেদ্দা শহরে থাকি। আমার পাশেই বন্ধু শরীফ থাকে। ছুটির দিন তার
বাসায় গিয়ে বিসত্দারিত বললাম। তখন শরীফ বলল, আমার বোন থাকে আমেরিকায়।
চিনত্দা করিস না দেখি আলাপ করে। শরীফ আলাপ করার পর আমাকে কাগজপত্র দেয়। আমি
ভিসার জন্য অ্যাম্বাসিতে দাঁড়াই। দুর্ভাগ্যবশত আমার ভিসা হলো না। কারণ
কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশে প্রলঙ্কর ঘূর্ণিঝড় হয়ে প্রায় ৭০ হাজার লোক মারা
যায়। ঠিক তারই এক সপ্তাহ পরে আমার ইন্টারভিউ ছিল। আমার ভিসাটা ছিল আমি তিন
মাসের ছুটিতে যাব এবং সেই সময় পড়ালেখা করব। ইন্টারভিউর সময় আমাকে জিজ্ঞেস
করলেন তোমার পিতা-মাতা আছে? আমি বললাম আছে। তারপর জিজ্ঞেস করল তারা কোথায়?
আমি বললাম বাংলাদেশে। তোমাকে যে কাগজপত্র দিয়েছে সে কি হয়? আমি বললাম চাচা।
সাথে সাথে বলল, তোমাদের দেশে তো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। ছুটিতে দেশে যাও বাবা-মাকে
দেখে এসো। ভিসা হলো না- সত্যি কথা বলার জন্য। আমি যদি বলতাম বাবা মা নেই,
চাচাই আমাকে দেখাশুনা করে তাহলে ভিসা হয়ে যায়। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বন্ধুরা
সবাই বলতেছিল কেন আমি মিথ্যা কথা বললাম না। আমেরিকায় চাচাকে ফোন করে বলে
দিলাম ভিসা হয়নি। তিনি সান্ত্বনা দিলেন। তারপর ১৯৯৪ সালে চাচা সপরিবারে
দেশে যাচ্ছেন বেড়াতে। আমি সেই সুবাদে আমার আব্বাকে ফোন করে বলে দিলাম যেন
তাদেরকে আপ্যায়ন করা হয়। আব্বা যথারীতি ঢাকায় চাচাদের বাসায় গেলেন দাওয়াত
করার জন্য গিয়ে দেখেন আমার বাবার বাল্যকালের বন্ধু একই সাথে লেখাপড়া
করেছেন। তারপর দেখলেন চাচার মেয়ে লিজা যার চুলগুলো বাতাসে উড়তেছিল। আব্বা
বাসায় এসে আমার আম্মাকে বললেন লিজা তো দেখতে সুন্দরী মনে হয় ছাত্তার পছন্দ
করেছে। তারপর আমার আব্বা ও তার বন্ধু বজলুল গনি বসে বিবাহের কথা ঠিক করে
ফেলে। আমি এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে চলে আসি এবং বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ৭ দিন
পর লিজা আমাকে ছেড়ে আবার আমেরিকায় চলে গেল।
আমাকে ভিসা দিয়ে ১৯৯৬ সালে আমেরিকা নিয়ে আসে। আমেরিকা এসে কয়েকদিন ঘুম আর
খাওয়া। কারণ সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড ছাড়া এ দেশে কাজ করা যায় না। তারপর
শুরম্ন হল জীবনযুদ্ধ। ওয়াশিং্টন ডিসিতে থাকি তাই এখানে ঠিক মত পেপার এবং
ম্যাগাজিনগুলো পাওয়া যায় না। আবারো শুরম্ন করলাম সাপ্তাহিক চিত্রবাংলা
প্রবাস কলামে লিখা। ১৯৯৬ সালে মাকে নিয়ে একটি লেখা দারম্নণ সাড়া পড়ে। আমি
সারা পৃথিবী থেকে প্রায় ২ হাজার চিঠি, ম্যাসেজ পেয়েছি। এ থেকে সাপ্তাহিক
চিত্রবাংলার প্রবাস কলামে দু-কলাম লিখি।
২০০৬ সালে ক্লোজআপ ওয়ান নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি অনুষ্ঠান হয়। সেখানে
আমার বন্ধু মনিরের বাসায় জাকারিয়া মাসুদ জিকোর সাথে পরিচয়। তখনই এখন সময়
পত্রিকার কথা জানতে পারি। সেই থেকেই এখন সময় পত্রিকাতে কাজ করে যাচ্ছি।
প্রথমে ছবি এডিটিং এ কিছু অসুবিধা হতো সেই সময় শামীম হায়দার ক্যামেরা ও ছবি
এডিটিংএ আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। এখন সময়'র মত একটি পত্রিকার সাথে জড়িত
হয়ে এই পর্যায়ে কাজ করব এমন কল্পনা আমি কোনদিনই করিনি। এই সত্যটি
নির্দ্বিধায় বলতে আমার সংকোচ নেই। এখন সময়'র সাথে জড়িয়ে আমি যে তৃপ্তি
সম্বৃদ্ধির সুযোগ পেয়েছি তাও কল্পনাতীত।
এখন সময়'র পৰ থেকে আমি ইউএস সিনেটর মাইকজুন্ডা, মেম্বার অব কংগ্রেজ ডেল
বারটন, ইউএস অ্যামবাসাডার মারটিন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, লালন
সঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভিন এবং ইউএস বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার
মুখোমুখি হতে পেরেছি। এখন সময় প্রতিনিধিত্ব করে আমি মেট্রো ওয়াশিংটন
সাংবাদিক ফোরামের সদস্য সচিব।
এখন সময় আজ ৯ বছরে পদার্পণ করলো। আমেরিকা প্রবাসী বাঙালিদের নিকট তা একটু
বিস্ময়ের। এই পত্রিকাটির ভূমিকা ভিন্ন রকমের। বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার কারণে
আর্থিক সাফল্যও নেই। পৃষ্ঠপোষকতা কম। অনেক বিষয়ে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায়
রেখে একটি পত্রিকা ৮ বছর অতিক্রম করা বিস্ময় এবং গৌরবের। আমি ও অমরা যারা
এই পত্রিকার সঙ্গে জড়িত তারা একটি গর্বিত পরিবার। সচেষ্ট থাকবো এই দুর্লভ
গৌরবের মর্যাদা উর্ধে রাখতে। মহান আলস্নাহ আমাদেয় সহায়।
ওয়াশিংটন ডিসি
এখন সময় : ভিন্ন মাত্রার পত্রিকা
কাজী
শা্;হ্নাজ
সমাজ ও জাতির উন্নয়নে গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা আছে এবং এটা অনস্বীকার্য।
গণমাধ্যম মানুষের জীবন সঞ্চালনের একটি অন্যতম উপকরণ। এমন একটি উপকরণ হচ্ছে
নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা সাপ্তাহিক এখন সময় যা গণসংযোগে সক্রিয়। এখন
সময় ভিন্ন মাত্রার ভিন্ন স্বাদের ও ভিন্ন আচ্ছাদনের ভিন্ন অবয়বের একটি
পত্রিকা। পত্রিকাটি সমষ্টিগত জনমানুষের একটি কণ্ঠস্বর। পৃথিবী সম্বন্ধে
নানা অজানা তথ্য, মানুষের কথা, মানুষের আদশর্, নীতি-রীতি, রাজনীতি,
সামাজনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা-বিজ্ঞান প্রযুক্তি, বিভিন্ন তথ্য প্রতিবেদন
বৈচিত্র্যময় করে পরিবেশিত হয় এখন সময় এ। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনমত গঠনে গত ৮
বছর যাবত এখন সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। গল্পে, ছন্দে ও প্রবন্ধে
বাঙ্গয়তা প্রকাশ পেয়েছে পত্রিকার পাতায় পাতায়।
পাঠকের কাছে গণমাধ্যমের একটি বাহন হিসেবে এখন সময় সময়োপযোগী । সময় ফিরে
পাওয়া যায় না, সময় চলে যায়। সময় গতিশীল, কখনো থেমে থাকে না। সময়ের মতো
পলাতক আর কেউ নয় কিংবা আর কিছু নেই। তাই পলাতক সময়কে নিয়ে এবং পলাতক সময়ে
ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহ নিয়ে এখন সময়-এর সমাহার নয়, এর উপস্থাপনা চলমান
সময়ের অর্থাৎ যখন যে সময় সেই সময়ের। আর এখানেই পত্রিকাটির নামকরণের
সার্থকতা। এখন সময় শব্দের মানে সময়োপযোগী যা বিগত নয়। এর আবেদন সরল ও ঋজু।
বিষয়বস্তুর আলোচনা কোথাও অগভীর ও অস্পষ্ট নয়। ঘটনার বিবৃতি ও তাৎপর্য
বিশেস্নষণ অতিরঞ্জিত কিংবা কঠিন নয়। পত্রিকাটি পাঠকালে মনে হয় এ যেন দেশ ও
দশের, জীবন ও সমাজের, নিজের ও অন্যের সময়োপযোগী দর্পণ।
শিল্প চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় শিল্পবোধ। শিল্প আত্মার সংস্কার সাধন করে।
নিজের আত্মাকে ছন্দময় করে যথার্থভাবে। শিল্পী গড়ে চলে নিজের কাজের সঙ্গে
নিজেকে ফোটার মূল্যবোধ থেকে। এভাবেই প্রস্ফুটিত হয় শিল্পবোধ। এখন সময়-এ
কর্মরত শিল্পীদের শিল্প প্রবৃত্তের কারণে পত্রিকাটির আদ্যপানত্দ শিল্পবোধে
পরিমন্ডিত। শিল্পী থেকে শিল্পী তৈরিকরণ এমন এক আলাদা মনোজগতের বহতা দেখা
যায় এখন সময়-এ, তাদের মানসিকতায়। তাই এখানে প্রাণের উচ্ছ্বাস পেয়ে অন্যরা
শিল্পী হতে উদ্বুদ্ধ হন, শিল্পী হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় এই পত্রিকায়। যেমন
কেউ লেখক কেউ সাংবাদিক কেউ চিত্রগ্রাহক কেউ ডিজাইনার কেউ অর্গানাইজার আরো
অনেক। মোট কথা এখন সময় একটি ভিন্ন মাত্রার পত্রিকা।
আরো বেশি দীপান্বিত হোক এখন সময়, আরো বেশি প্রসারিত ও প্রচারিত হোক এখন
সময়।
ব্রঙ্কস, নিউ ইয়র্ক
এখন সময়-এর সেই দিনগুলি
সৈয়দা
মুশতারী দিপ্তী
সঠিক তারিখটা মনে পড়ছে না তবে সেদিন খুব ঠান্ডা পড়েছিল যেদিন প্রথম
গিয়েছিলাম 'এখন সময়' পত্রিকায় ইন্টারভিউ দেবার জন্য। ২০০০ সালের শুরম্নর
দিকে সানি সাইডের অফিসে ইন্টারভিউর জন্য আমাকে আসতে বলা হয়েছিল। ভীষণ ভয়
করেছিল আবার খুশিও লাগছিল। ভয় করছিল এই কারণে যে জীবনে কখনো পত্রিকা অফিসে
কাজ করার কোন অভিজ্ঞতাতো ছিল না। এমনকি সাংবাদিকতার 'সা' এর জ্ঞানটুকুও
আমার ছিল না। আর খুশি লাগছিল এই কারণে যে, মনের মধ্যে অনেক আশার একটি আশা
ছিল মিডিয়াতে কাজ করার। যদিও চাকরিটা হবে কিনা নিশ্চিত নই তারপরও মানুষতো
পজেটিভি দিকটা বেশি ভাবি। একটা কথা, আমি যখন ইন্টারভিউর জন্য গেলাম তখন
আমার আমেরিকায় অবস্থানের বয়স মাত্র কযেক মাস। যদিও ব্যাপারটা তেমন কিছুই নয়
তবুও নতুন কোন জায়গায় এলে মনে হয় কি যেন কি বলতে কি বলি, কে আবার কি মনে
করে। প্রথম প্রথম এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক আসলে বাসত্দবে তেমন কিছুই নয়।
যাইহোক অনেক সাহস নিয়ে পেঁৗছলাম এখন সময়ের অফিসে। সম্পাদক সাহেবের রম্নমে
ঢুকে দেখলাম উনি কম্পিউটারে কিছু কাজ করছিলেন। আমি সালাম দিয়ে আমার পরিচয়
দিলাম। তারপর বিভিন্ন কথাবার্তার পর যখন আমি জানলাম এখন সময়ের একজন
মার্কেটিং-এর লোক দরকার তখন আমার এতো রাগ হল যা বলার নয়। তুবও ঐ মুহূর্তে
আমার একটি কাজের খুব প্রয়োজন ছিল তাই নিজেকে স্বান্ত্বনা দিয়ে বললাম আমি
পারব। সম্পাদক সাহেব অবশ্য আমাকে সাহস দিয়ে বললেন হঁ্যা তোমাকে দিয়েই হবে
বললেন। তার পরদিন কাজে যোগ দেবার প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে সেদিনের জন্য বিদায়
নিলাম।
পরের দিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখি তখনও অফিসে কেউ আসেনি। আমি মনে হয় চাকরি
পাবার খুশিতে সময়ের আগেই চলে এসেছি। কিছুৰণ পর সম্পাদক সাহেব এলেন। অফিসে
ঢুকতেই প্রথম রম্নমের একটা টেবিল দেখিয়ে বললেন তুমি এখানেই বসবে। তারপর
আমার হাতে কিছু কাগজ দিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিলেন। সত্যি কথা বলতে কি এই
মার্কেটিং প্রফেশনটা যদিও ভাল তবুও কেন যেন আমি একদম পছন্দ করি না। মানুষকে
ঈড়হারহপব করার মতো কোন গুণই আমার নেই। আসলে আমার মাথাটা মনে হয় একটু গরম
অল্পতেই রেগে যাই। ধৈর্য্যটা আমার নেই বললেই চলে বিশেষ করে এই ব্যাপারে। আর
মার্কেটিং এর জন্য ধৈর্য্য শক্তিটা একটু বেশি থাকতে হয়্ কি আর করা কাজের
প্রতি ম্রদ্ধা দেখিয়ে হলেও আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে হলো। লজ্জার কথা
কি জানেন, আমি মনে হয় একটা কি দুইটা এ্যাড আনতে পেরেছিলাম কিন্তু তারাও
এ্যাড পত্রিকায় প্রকাশ হবার পর ঠিকমত টাকা পেমেন্ট করেনি।
কিছুদিন কাজ করার পর মনে হলো আমি মনে হয় কোন কাজের না। কিছুই করতে পারছি
না। আসল কথা আমি যে প্রফেশনে কাজ করে এসেছি তার কিছুটা এখানে করার সুযোগ
থাকলেও আমি করতে পারছিলাম না। আর যে কাজ করছি সে কাজের জন্য আমি উপযুক্ত
নই।
কম্পিউটারের ওপর আমার বরাবরই দুর্বলতা ছিল। কিছু জানি বা না জানি কম্পিউটার
দেখলেই আমার ইচ্ছে করতো ওর সামনে বসে ঘাটাঘাটি করতে। এই জন্য আব্বুর কাছে
প্রথমে অনেক বকা শুনলেও পরে আব্বু বুঝেছিলেন এটা আমার সখ। তাই তিনি মনে মনে
ঠিক করেছিলেন আমাকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়াশুনা করাবেন কিন্তু এতে
আমার আগ্রহ না দেখে মনে মনে একটু আহত হয়েছিলেন। ছোটবেলা ড্রইং করতে পছন্দ
করতাম এবং স্কুলেও ড্রইং-এ সবচেয়ে বেশি মার্কস পেতাম তাই বলে অন্য বিষয়ে যে
খারা ছিলাম তা নয়। স্কুল জীবনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আমার ভাই। আমরা
দু'জন পিঠাপিঠি হওয়ার সুবাদে আব্বু আমাদের দুই ভাইবোনকে একই স্কুলে একই
ক্লাশে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তখন আমরা দুই ভাইবোন ঐ স্কুলের সেরা
ছাত্রছাত্রী ছিলাম। সবসময় আমার ভাই যদি প্রথম হতো তবে আমি হতাম দ্বিতীয় আর
আমি প্রথম হলে সে হতো দ্বিতীয়। আসলে আমার ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবার কিন্তু তা
না হয়ে ডিজাইনার হবার শখটাকে পূরণ করলাম। এতোকিছু বলতে গেলেতো আমার জীবনীস
লেখা হয়ে যাবে। আসলে আমিতো এখন সময় পত্রিকায় কর্মকালীন সময়ের দিনগুলো নিয়ে
কিছু লিখতে বসেছি। যাক এখন আসল কথায় আসায় যাক।
একদিন আমি অফিসে গিয়ে দেখি কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে কেউ আসেনি তাই আমি আমার
লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। গিয়ে বসলাম কম্পিউটারের সামনে। কিছুৰণ পর
সম্পাদক সাহেব এলেন এবং আমাকে কম্পিউটারের সামনে দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়ে
(যদি এটা আমার ভুল ধারণা হতে পারে তবে আমার মনে হয়েছিল) বললেন তুমি এখানে
কি কর? আমি বললাম তেমন কিছুই করি না। তারপর উনি আমাকে আমারকাজ করতে বলে
রম্নমে চলে গেলেন।আমি কিছুটা মন খারাপ করে গিয়ে টেবিলে বসলাম।
কিছুদিন পর একদিন সকালে হঠাৎ সম্পাদক সাহেব আমাকে এসে বললেন তুমি কি বাংলা
টাইপ করতে পার? আমি বললাম কিছু কিছু পারি। তারপর উনি বললেন যাক ভালই হলো
আমার কিছু নিউজ কম্পোজ করতে হবে। পরের দিন সকালে অফিসে এসে দেখি সম্পাদক
সাহেব আমার টেবিলে একটা কম্পিউটার সেট করে দিয়েছেন। আমার খুশি আর কে দেখে।
আমি ভাবলাম যাক ভালই হলো। কিছুৰণ পর আমার অফিস রম্নমে ডাক এলো। আমি যেতেই
সম্পাদক সাহেব আমাকে কিছু নিউজ বাংলায় টাইপ করতে দিলেন।আবার সেই বোরিং কাজ
তবুও খুশি হলাম ধঃ ষবধংঃ কম্পিউটারের সামনে তো বসতে পেরেছি। তার কিছুদিন পর
আবার আমাকে আরেকটা কাজ দিলেন তা হলো এখানকার ইংরেজি পত্রিকা থেকে নিউজ নিয়ে
সেটাকে বাংলায় ট্রান্সলেট করে কম্পোজ করতে। খুশি হয়েই কাজ করতে লাগলাম। ইু
ঃযব ধিু সম্পাদক সাহেব কিন্তু তখনও জানতেন না যে আমি বাংলাদেশে একটি
টেক্সটাইল কোম্পানিতে গ্রাফিক্স ডিজাইনার ছিলাম। এভাবে গেলো আর কিছুদিন।
একদিন আমি পত্রিকার একটি এ্যাডের ডিজাইন করেছিলাম সম্পাদক সাহেব ঐ ডিজাইনটি
দেখে আমাকে বললেন তুমি কি ফটোশপের কাজ জান? আমি বললাম জি্ব। তারপর
বাংলাদেশে কোতায় কাজ করতাম সব জানলাম তা শুনে উনি শুখি হয়ে বললেন ভালই হলো
আমার একজন পেইজ মেকিং এর লোক দরকার ছিল তা পেয়ে গেলাম। আর আমি...আমার খুশির
কথা এখানে লিখে প্রকাশ করা যাবে না। যদি গল্প বা সিনেমার ডায়লগ এর ভাষায়
বলি তবে বলতে হয় আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি যদিও সত্যি কথা বলতে
বাসত্দবে আমাকে এখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছে প্রতিনিয়তই...থাক সে প্রসঙ্গ।
সেইদিন থেকে শুরম্ন হলো আমার মনমতো কাজ। তখন ঐ সেকশন-এ আমি আর সজীব কাজ
করতাম। আর নিয়াজ ভাই করতেন ফিনিংশ।
সজীব ওর কথা কি বলব খুবই ইন্টিলিজেন্ট ছেলে ওর কাছ থেকে আমি অনেক কিছু
শিখেছি ওর একটা প্রবলেম ছিল। আসলে প্রবলেম বললে ঠিক হবে না এটা ওর একটা
অভ্যাস। আর তা হলো ও যদি আমাকে বলে গেলো আপা কালকে সকাল ১১টায় দেখা হবে
তাহলে মনে করবেন ওর সাথে দেখা হবে পরের দিন রাত ১১টায় এবং যদি কখনো বলে যায়
আগামী কাল রাতে দেখা হবে তবে বুঝতে হবে আগামীকাল নয় আগামী পরশু দুপুরে দেখা
হবে। কাজের ব্যাপারে ওর গুণ বলে শেষ করা যাবে না। সজীবের আম্মা চমন আরা
আন্টি, ওনার রান্নার কথা আর কি বলব এখনও মনে হলে জিভে পানি এসে যায়। সেদিন
আন্টি রান্না করে নিয়ে আসতেন কম করে হলেও ৮ থেকে ১৯ রকমের আইটেম থাকতো।
পত্রিকা ডেলিভারিতে যারা কাজ করতো তাদের মধ্যে পংকজ-নামটা হিন্দু শোনালেও ও
ছিল আসলে মুসলমান অবশ্য ও এখন কানাডায় থাকে স্বপরিবারে। ওকে ফোন করে পাওয়া
ছিল খুবই দুস্কর। তবে ্কাজের ব্যাপারে সিরিয়াস ছিল। শাহরিয়ার ভাই অফিসে
ঢুকে একটা হাসি দিয়ে বলতেন কি ব্যাপার আপা কেমন আছেন? খুবই হাসিখুশি এবং
মিশুক ছিলেন। তিনি মার্কেটিং ও পত্রিকা ডেলিভারিতে অনেক সাহায্য করতেন।
শুধু তাই নয় কোথাও যেতে হবে, শাহরিয়ার ভাইকে যদি বললাম আমাকে একটু ড্রপ
করতে হবে তাহলেই হলো নিজের যত অসুবিধা হোক কিছু বলতেন না নিয়ে যেতেন।
আর জুবায়ের, ওকে শুধু ফোন করে বললেই হলো জুবায়ের আমাদের খুব ক্ষুধা লেগেছে
কিছু খেতে হবে ব্যস, কোন কথা নেই বলতো চলেন আলাদ্দিন থেকে খাবার নিয়ে আসি
কিংবা কোন ভাল রেস্টুরেন্ট থেকে। জুবায়ের এখন জ্যাকসন হাইটস এর আলাউদ্দিন
সুইটস এর একজন অন্যতম সত্ত্বাধিকারী। সেই সেই সময় এখন সময়ের ফটো সাংবাদিক
ছিলেন নিহার সিদ্দিকী। ফটোগ্রাফিতে তার ভাল হাত ছিল। চমৎকার ছবি তুলতেন।
আমি তো একবার ভেবেছিলাম উনার কাছ থেকে ফটোগ্রাফীর উপর কিছু লেসন নিব।
কিছুদিন প্র্যাকটিসও করেছিলাম। কিন্তু সেই একই প্রবলেম ধৈর্য্য। শুধুমাত্র
রান্না আর কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করতে আমার ধৈর্যচু্যতি হয় না। তাই
কিছুদিন চেষ্টা করার পর আর শেখা হলো না।
আমাদের অফিস সানি সাইড থেকে এলামহাস্ট এ স্থানানত্দরিত হলো। ওখানে যাবার পর
নতুন কিছু কলিগ এর সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। উনাদের মধ্যে ছিলেন ড.
আসিফ নজরম্নল। আসিফ ভাই যখন কোন বিষয় নিয়ে কিছু বলতেন প্রতিটা বিষয় এতো
সুন্দর করে ব্যাখ্যা করতেন শুনতে খুবই ভাল লাগতো। তারপর মাহফুজা শিলু আপা
এখন সময় পত্রিকার নিউজ লিখতেন। আমাকে খুবই আদর করতেন। তারপর এলেন মঞ্জুর
আহমেদ, ইরফান উল বালী আরো অনেকে আমার নাম মনে করতে পারছি না। এখন সময় এ
কাজের সুবাদে আমি আমি অনেক পবষবনপরঃু ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ
পেয়েছিলা।
এখন সময় অফিসে আমার শেষ কাজ করার দিনটি ছিল আমেরিকার জন্য একটা ঐতিহাসিক
এবং ঢ়ধরহভঁষ দিন ২০০১ এর ৯/১১। ঐ সময় অর্থাৎ সেই সপ্তাহে এখন সময় কাজ করার
মত আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। কারো াধপধঃড়ঢ়স কিংবা কেউ ঝরপশ এর কারণে অফিসে
অনুপস্থিত ছিল। তাই আমি যখন চলে এসেছিলাম তখন কারো সাথে আমার বিদায় নিয়ে
আসার সুযোগ হয়নি। সে কারণে আজো এখন সময় থেকে আমার বিদায় হয়নি।
এখন সময়ের সবাই এতো ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরাব ছিলাম যে তা সত্যিই খুবই বিরল। অবশ্য এর
সম্পূর্ণ কৃতিত্বটাই একজনের। উনি এতো বিচৰণভাবে অফিসের সবাইকে পরিচালনা
করতেন যে কোন অভিযোগ করার সুযোগ হতো না। এখন সময় আমার মেমোরিতে স্থায়ীভাবে
ইনস্টল হয়ে আছে। যখনই ডাক আসবে সাড়া দেব।
্ল_ নিউইয়ক
এখন সময় নয় বছরে
পাপিয়া রহমান
নিউইয়র্কে আসার কিছুদিনের মধ্যেই আমি এখন সময় এ কাজ শুরম্ন করি। আমার
স্বামী সেলিম নিউইয়র্কে সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সবার কাছে সুপরিচিত
হওয়ায় এখানকার পত্র-পত্রিকার সকলের কাছাকাছি তিনি। আর আমার পত্রিকায় কাজের
অভিজ্ঞতা ঢাকা থেকেই। আমার বড় ভাই এর আরামবাগে প্রেস । কম্পোজ ও কোয়ার্ক
গ্রোগ্রাম মোটামুটি জানা ছিল। ভাইবোন মিলে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতাম..।
নিউইয়র্ক এসে চার পাঁচটি নিয়মিত সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ হতে দেখে আনন্দ ও
ভরসা পেলাম। কাজ একটা পাবই। সেলিম আমাকে নিয়ে গেল এলমহার্স্টের তিনতলায়
সাবওয়ের উপরে ওঠার মত সিড়ি বেয়ে। হাপিয়ে উঠেছিলাম। কারণ তখন আমি শারিরিক
অসুস্থ ছিলাম। এটিই 'এখন সময়' পত্রিকার অফিস। তখন অফিসে সম্পাদক ছাড়া আর
কেউ ছিলেন না। আমার ইন্টারভিউ হল। মনে হল কাজটি আমার জন্যই অপেৰা করছিল।
কম্পোজেরর কাজ সপ্তাহে ৫ দিন। বেতনও ধার্য হল। কিছুদিন পরই আমি সনত্দানের
মা হব। বিদেশে নিকট স্বজন থেকে দূরে এসে এখন সময়'র পরিবেশটা আমার জন্য
মানানসই করে নিতে দেরী হল না। আমার আর একটি সুবিধে হল- পত্রিকার সম্পাদক
সবার জন্য 'ভাই' হলেও আমার আঙ্কেল। আমার এই উপরি পাওনা ছিল ঐ সময়ের
পরিস্থিতিতে পিতৃত্বের ছায়ার মত। ঐ অসুস্থ অবস্থায় আঙ্কেল আমাকে অনেক
সাহায্য করেছেন। খাওয়া-দাওয়া কখন কি খাব সব সময় আমার বাবার মত জিজ্ঞেস
করতেন। আমি ভুলেই যেতাম আমার এখানে পরিবারের কেউ নেই। এই দেশে কেউ কাউকে
ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করার সময় নেই, তাও আবার অফিসে। কিন্তু আমি ভাগ্যবতী ছিলাম
বলেই আমি এমন একটি পত্রিকায় কাজ পেয়েছিলাম। সে সময় অফিসে সহযোগি সম্পাদক
মঞ্জু ভাই প্রম্নফ দেখায় এত পারদর্শী ছিলেন যে কম্পোজে খুবই সতর্ক থাকতে
হত। মিনার মাহমুদ ছিলেন বিশেষ সংবাদদাতা। অফিসে সিগারেট শুধু মিনার ভাইর
জন্যই অনুমতি ছিল। তিনি একটির পর একটি সিগারেট পুড়িয়ে পাতার পর পাতা লিখে
যেতেন একটানা। আমার জন্য কামরা ভিন্ন থাকায় সিগারেটের ধূয়া আমার কাছে
পেঁৗছাতো না।
রিপোর্ট করতেন আজাদ শিশির। নিহার ভাই ছবি নিয়ে আসতেন। এখন সময়'এ একটানা কাজ
করেছি চার বছর। কম্পোজে আমি খুব দ্রম্নত হবার কারণে বিষয়টি বিবেচনা করতেন
সবাই। সেই সাথে সম্পাদকও। সাপ্তাহিক 'কাগজ' প্রকাশের পর সেখানে কম্পোজে
লোকের প্রয়োজন। কিন্তু তখন এত কম্পোজের লোক ছিল না। আমাকে বার বার অনুরোধ
করার বিষয়টি 'এখন সময়' সম্পাদককে বলাতে তিনি নির্দ্বিধায় অনুমতি দিলেন। আমি
সপ্তাহে একদিন কাগজে কাজ করতাম পরে অবশ্য পুরোপুরিই কাগজে কাজ করি। কিন্তু
আমার কখনো মনে হয়নি আমি এখন সময় ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করি। আমার মনে হয়েছে
এবং এখন মনে হয়- আমি এখন সময়েই।
এখন সময়-এ কাজ করতে গিয়ে অল্প সময়ে ঘনিষ্ঠ হই ফারহানা আপার সাথে। তিনিও
শুধু আমার সাথেই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সাকিনা ডেনী আপা, সজিব ও নিয়াজ ভাইর সাথে
কাজ করেও আনন্দ ছিল। তাদের কাছ থেকে অনেক শেখার সুযোগ পেয়েছি।
একটা সুন্দর পরিবেশ ছিল যেখানে আমরা কাজ করেছি। সময় কিভাবে কেটেছে, এখন
সময়-এ টের পাইনি। আজ যখন পত্রিকায় দেখলাম ১৮ নভেম্বর প্রকাশিতব্য সংখ্যাটি
৯ম বর্ষের ১ম সংখ্যা বিশ্বাস হতে চায় না। মনে হয় এই সেদিন। এখন সময়ের সাথে
পালস্না দিয়ে আমার ছেলের বয়সও বাড়ছে। এখন তার বয়স ছয়। এভাবেই সময় শেষ হয়ে
যায়। স্মৃতিগুলো থাকে, আছে, থাকবে। যেমন থাকবে এখন সময়। এখন সময় ও আমরা একই
পরিবার।
নিউ ইয়র্ক
'এখন সময়' নিরবে ৯ বছর
_
শাহরিয়ার
জ্যাকসন হাইটসে এসে দীপ আপার সাথে দেখা নকসীতে। তিনি মনোযোগ দিয়ে
কম্পিউটারে (লেপটপে) কি টাইপ করছেন। জানতে চাইলে বললেন 'এখন সময়'র জন্য
একটি লেখা তৈরি করছেন। জানতে পারলাম এখন সময় ৯ বছরে পা দিচ্ছে। কেমন করে
কেটে গেল? এই সেদিনের কথা। কুইন্স বস্নুভার্ডের দোতলায় 'এখন সময়' অফিস।
মার্কেটিং-এর দায়িত্ব ছিল আমার। কিন্তু কাজ করতে হত ভিন্ন ধরনের। কোথায়
অনুষ্ঠান হচ্ছে-ছবি তোলা বা রিপোর্টটা সংগ্রহ করে নিয়ে আশা। মূলত ছবির
দায়িত্বে ছিলেন নিহার ভাই। নিহার ভাই হাতের কাছে না থাকলেই আমার পালা।
মার্কেটিং-এর দায়িত্বে থাকলেও আমার ডিসক্রেডিট ছিল কালেকশনে। এই কাজটি আমার
হত না। আজকাল করে ঘুরাতো। এভাবে শুরম্নতেই মার্কেটে প্রচুর পাওনা জমে যায়।
এখন সময় দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করলে আমি শরীফ ভাই ও আশরাফ ভাই মিলে
টেলিভিশন চালু করলাম, এনবিবি। তখন আর এখন সময় এ মনোযোগ দিতে পারিনি।
সেদিনের কথাগুলো ভুলতে পারি না। জুবায়ের, তমাল, নিহার ভাই, সজীব, শিলু আপা,
দীপ এনাদের কথা এখনো স্মৃতিতে জল জল করে।
মা আমার নাইয়র যাবেন
ডাঃ
ইকবাল আনোয়ার
চৌকির নীচ থেকে কাঠের তক্তার উপরে রাখা ফল আঁকা টিনের ট্রাংক বের করে আনা
হল। ট্রাংক খুলতেই নেপথালিনের গন্ধ। সেখানে ভাঁজহীন অনেক কাপড়ের নীচে
জর্জেটের নীল শাড়ী। এ ঘরের আভিজাত্যের প্রধান নিদর্শন। শাড়ীটা ছিল একদম
নীচে। সঁ্যাতসঁ্যাতে ঘরে চৌকির নীচে থেকে থেকে ট্রাংকটাতে মর্চে পড়ে গিয়ে
ছিল। তা খেয়াল হয়নি মায়ের।
আজ বহুদিন গ্রীষ্মের ছুটিতে নানা বাড়ী বেড়াতে যাবার অনুনয়ে বাবার সায়
মেলাতে সেই ট্রাংক খুলতে হল। শাড়ীটা ট্রাংকের জংএ আটকে গিয়েছে কতকটা। তাতে
কি? জর্জেট বলে কথা। এটাই মায়ের মূল্যবান তাবরণ। বিছানার উপর তিব্বত
পাওডার, তিব্বত স্নো। আমরা সকাল সকাল উঠে গোসল সেরে নেচে নেচে বিছানায়
কাপড় পরছি। মুখে স্নো মেখে দিচ্ছেন মা। স্নো পাওডারের গন্ধে ঘরটা মৌ মৌ
করছে। ঈদের আনন্দ আর আমেজ যেন ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
_ খামখা কি দরকার ছিল এত কষ্ট করে যাওয়ার।
মায়ের নকল বিরক্তি মাখা উক্তি। মামা দুদিন আগেই এসেছিলেন। তিনি বেডিং
বাঁধছেন রশি দিয়ে। এ কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত। তোষক, বালিশ, চাদর, তার উপর কিছু
কিছু কাপড়। এগুলো বাগর্ার, হটডগ এর আকৃতিতে বেঁধে ফেলছেন তিনি।
_ বুবু, কি যে কও। কতদিন বাড়ীতে যাও না। সব বইনেরা আইব। তুমি সবার বড়। না
গেলে কেমন লাগে কওতো। দুলাভাই কয়েকদিন না হয় কষ্ট করবো। সারা জীবনতো
দুলাভাইরে ভাত রাইন্দা খাওয়াইছো। কিছুদিন না হয় নিজে রাইন্দা খাইব।
বাবা আমার নিম রাজি। বসে বসে পিতলের হুক্কা টানছেন। আর জরুরী জিনিস নেওয়া
হচ্ছে কিনা, তার দু একটা খেয়াল করে দিচ্ছেন। বিশেষত আমার পড়ার বই। আমি
বলছি- বই যেন একটাও বাদ না যায়। আমাকে খুব করে পড়তে হবে। সামনে পরীক্ষা।
আমার না গেলেই ভাল হত। যেন আমি কত পড়ার লোক।
আসলে আনন্দের কালে এসব কৃত্তিম কত কথাই না বলা হয়। আমিতো ভালই জানি নানা
বাড়ীতে গেলেই সারা গ্রাম পই পই করে বেড়াবো। ঢিল ছুড়বো পুকুরে। বরশীতে জিরের
আধার আটকে নির্মমভাবে তার নড়াচড়াকে উপেক্ষা করে নখে কেটে মুখে থুতু দিয়ে
(মুখ দোষ থেকে রক্ষার উপায়) দাতনাসহ জলে ছুড়ে দিয়ে মজা পুকুরে শেওলার ঝোপের
নীচে বনের গুচ্ছ গোল করে বসার জায়গা করে টেংরা মাঝ ধরবো। ফাতনা ডুবে যেতেই
মানন্দে বুকের খাঁচায় অনিশ্চয়-নিশ্চয় ফলগুধারায় রূটানায় এক পরম অনুভূতিতে
ছিপে টান দিতেই টকটকে চাউল টেংরাটা নড়তে নড়তে মনটাকে প্রফুল্লতায় ভরে দিবে
কানায় কানায়। এ আনন্দে পড়ার কথা ভুলেই বসে থাকবো। অথবা নিতান্তই কিশোর
কিশোর খেলায় আমার চেয়ে বছর দু'একএর ছোট খালাত বোনটাকে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে
রেলপথের পাশে ধানী জমির মাঝখানটায় শুয়ে মেথে আকাশে টিয়ার ঝাক দেখে দেখে
সন্ধ্যা ডেকে আনবো।
ট্রেনের টিকেট কাটার ঝামেলাটার কথা মনে হতেই সব আনন্দ যেন মাটি হয়ে যায়।
তার চেয়েই গভীরতম শংকায় হৃৎপিন্ড বন্ধ হয়ে যেতে চায় এই ভেবে যে ট্রেনে সবাই
বাকস পেটরাসহ উঠতে পারবো তো?
তবে সব 'কিছুতেই ভরসা হলেন মামা। খুবই পারঙ্গম। সদ্য গ্রাম থেকে শহরে
এসেছেন। কলেজ পড়ুয়া ছেলে। মাথার ঝাঁকড়া চুলে গন্ধ তেল মেখে চিরুনীর উল্টো
পিঠ দিয়ে সামনের দিকে দু তিনটা ঢেউ তুলে হাতে একটা ডাইরী ধরা অবস্থায় দু পা
কেচি করে নকল পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে স্টুডিওতে ফটো তোলে সে ছবি বাঁধিয়ে
রেখেছেন ঘরের ভিতরের বাঁকা পালায় পেরেক এটে। হাতে অবশ্যই ঘড়ি। ঘড়িটা
দেখানোও যেন ছবিটার একটা উদ্দেশ্য। এমন মামা কয়জনের আছে। দরকার হলে টিটিকে
একটা বকসিং দিলেও দিয়ে বসতে পারেন। চোখা অগ্রভাগ যুক্ত হাতের আংটিটাই তার
প্রমাণ।
হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেল। টিনের চালে প্রথমে পেটের পেটেরা তারবার ঝম ঝম। উঠানে
এক ইটের সাড়ি বসানো পথ যা গিয়ে রাস্তায় ঠেকেছে তাও গেল ডুবে। মনটা খারাপ
হয়ে গেল। মা কাপড় খুলে ফেলছেন। বাবা নির্বিকার। কলকেটাতে হাতের টিপে
টিক্কাটা নিভে যেন না যায় সেই চেষ্টায় সফল হবে বেশ ঘন ধোঁয়ার কুন্ডলী
ছড়াচ্ছেন। মামা কিন্তু না ছাড়।
বুবু কাপড় পরছোনা কেন? টেনকি বইসা থাকবো নকি তোমার জন্য। বৃষ্টি বাদলায় কি
হইব। আমি সব ব্যবস্থা নিমু। - নারে থাক। অন্য আরেক বার। আমাদের কলজে ছিঁড়ে
যায় যেন তা হলে এত সব মাটি! ট্রেনের ঝক ঝক। সামনে দিয়ে সব দৃশ্য দৌড়ে পাড়।
একটা কেতর আলী ট্রেনের কামরায় এসে খেলা দেখাবে। কসবা নেমে ট্রেনের কাছে
একটা গাছতলায় একটা দরিদ্র শিল্পীর অপূর্ব বেনজ বাদন। অনর্গল ধারায় জল গড়িয়ে
পড়ার একটা কল। মামা বাড়ীর বইঠক ঘরে মনিদের পুঁথিপড়া। বড় নানার গোসতঅলা বুকে
পিতলের একটা দাঁত খিলাল। হান্নান ভাই এর হাতে বানানো আমের বড়ার বাঁশী।
পারম্নলের হাতে নারকেলের পাতা ও শলার চশমা। উঠানে বসে পূর্ণিমার রাতে
মাখারাদের এক বেন্ডের রেডিওতে আব্বাস উদ্দিন, আলিমের গান শুনা। সকালের
কাঁচা রোদে মুড়ির মাঝখানে ঝুপ করে ফেলে দেয়া নানীর হাতের গুড়। তারপর রোদ
নিয়ে ঝগড়া, শিকলি। জাম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে শলিক পাখীর উদ্দেশ্যে বলা- পইকরে
পইক। একটা জাম দেছনা। অথবা দুপুরে আমের দলের টিনের চালে গরগরিয়ে শব্দ করে
হঠাৎ একটা এসে ঝপে পড়ে যাওয়া, আর সেটাকে পাওয়ার জন্যে সবার একশ মিটার দৌড়।
রাতে ট্রেনের শব্দে মামা বাড়ীর ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া। খড়ের গুম্বুজে লফিয়ে পড়া।
কড়া রোদে হঠাৎ হালকা বৃষ্টিতে ঘরের ভিতর গরম মিষ্টি গন্ধ শোকা। এলে নৌকা
চালিয়ে খাল পেড়িয়ে নদীতে গিয়ে শাপলা তোলা। কড়া বৃষ্টিতে খড়ের তৈরী ফুটবল
দিয়ে কেড়ে কেটে গোল দেয়া। উঠানে পিছলে পড়ে কিছুই হয়নি যেন এমন ভাব ধরা-এসবই
কি মাটি হয়ে গেল?
কিন্তু না বৃষ্টি থেমে গেল। বিধাতার এই অকৃপণ উপঢৌকন কেবলই আমাদের জন্য।
হাতে সময় নেই। আমরা ছুটলাম মামার পিছু পিছু রিক্সা খোজার পালায়। রিক্সা
লাগবে দু'টি। একটিতে মা উঠবেন, সঙ্গে ছোট ভাইটি এবং বোন। সেটার চারপাশে
মায়ের শাড়ী দিয়ে নেকাব পরানো হবে। মায়ের পর্দার জন্য। আমরা এসে ষ্টেশনে
নামলাম। বেডিং, ট্রাংক, সব ঠিকঠাক নেমেছে তো? ষ্টেশনের ফিমেল ওয়েটিংএ মামা
মায়ের জন্য একটা জায়গা করে দিলেন। বাথরুম থেকে কাঁচা প্রশ্রাবের তীব্র গন্ধ
আসছে। আমরা লাফ ঝাঁক দিচ্ছি। মা সামলাচ্ছেন যেন হাড়িয়ে না যাই। তারপর মামা
গেছেন ট্রেনের টিকেট আনতে। হাতে সময় নেই। হাফ টিকেট, ফুল টিকেট। আমরা
অনিশ্চয়তায় কাতর হয়ে পড়ছি। এবং মামা যখন শক্ত মলাটের টিকেট গুলি নিয়ে এলেন,
তখন এগুলোকে স্বর্ণের পাতের মত মূল্যবান মনে হচ্ছিল। তা হলে সত্যি আমরা
মামা বাড়ী যাচ্ছি।
রেলস্টেশনে জীবন বড় বিচিত্র মনোহর। বহুমুখী তৎপরতার এক অপূর্ব ককটেল হল
রেলের প্লাটফর্ম। যাপিত জীবনের সবকিছু থেকে কিছু কিছু তুলে এনে যেন কোন এক
বৃক্ষ বিলাসী যাদুকর এখানে একটা নতুন উদ্যান বানাবার অভিপ্রায়ে তৎপর
হয়েছেন। যেন এর নাম দিয়েছেন 'ম্যামালিয়ান গার্ডেন'।
চার পাঁচজন কেতাদুরস্থ ভদ্রবেশী দাঁড়িয়ে কথোপকথনরত। একজন ল্যাংড়া ভিখারীর
হাতপাতা যখন বিরক্তির পর্যায়ে যায়, তখন সে আসন্ন ধমকের পূর্বে সর্বশেষ কাতর
মিনতি জানিয়ে নতুন খদ্দেরের দিকে পুরনো ভঙ্গিমায় হাত বাড়ায়।
হিন্দু স্টলের অদূরে মুসলমান স্টল। কেন এই আলাদা নাম রাখা হল? কেনইবা আলাদা
বসার স্থান! বুঝার উপায় নেই। জাতিগত এক অহেতুক পার্থক্যের বীজ মনের কোমলে
রোপণ করার জন্য এটাই যথেষ্ট। কিন্তু সংস্কারের নিকুচি করে মানবের জয় হবে
একদিন এ কামনার বয়স নয় ওটা। একজন মানুষ ছোট টাই গ্লাসে গরম চায়ে চুবিয়ে
ইংরেজী এস অক্ষরের আকৃতির কুকিস বিস্কুট খাচ্ছেন। অর্ধেক কুকিস বিস্কুট
হাতে ধরে তিনি কিংবা সে বিষণ্ন_ধ্যান_মগ্ন। গন্তব্যে যাবার তাড়া রয়েছে তার।
কোন দুঃসংবাদ তার সঙ্গে ছায়ার মত লেপ্টে আছে। অথচ তার ট্রেনের কোনই খবর
নাই।
আরেকজন ক্যাশের বাক্সের পাশে অতি দ্রুত পয়সা রেখে ট্রেনের উদ্দেশে ছুট
দিচ্ছেন। নির্দয় ট্রেন। অন্ধ ট্রেন। কাউকে শান্তিতে উঠতে দেয়। কাউকে অনেক
ভোগায়। আবার কারো কারো অর্ধেক নিয়ে অর্ধেক রেখে চলে যায়। এরই মধ্যে কারো
কারো পকেটমার হয়। মহিলার সযত্ন আব্রু উপেক্ষা করেই ধর্মপ্রাণ পুরুষটির
একমাত্র উদ্দেশ্য এ যাত্রায় ট্রেনের কামরার নাগাল পাওয়া। এত সব যত রকম
যন্ত্রণা আছে সকল কিছুর ব্যথানাশক দাওয়াই কি 'বিষমজিম'? তা না হলে ফলাও করে
এ বিজ্ঞাপন টিনের পাতে বড় করে কারা প্লাটফর্মে লাগিয়ে রেখেছে?
গৃহছাড়া একদল প্রান্তিক দরিদ্র পরিবার চালচুলা পেতেছে প্লাটফর্মের এক কোণে।
তারই পাশে সিমেন্টের স্লাবে একদল দুষ্কৃতিকারী ছোবলের পরিকল্পনারত। অন্ধ
ভিখারীর দল গোল হয়ে বসে বিড়ি ভাগ করে খাচ্ছে। পরবর্তী কোরাস গানের আগে
ট্রেন আসার ফাঁকে জিরিয়ে নেয়ার এইতো ফুসরত। নখের অাঁচড়ে পয়সার কিনারা অাঁচ
করে গুনতির পালাটাও এখনই শেষ করা চাই। পরে আর সময় নাও মিলতে পারে।
পত্রিকার হকার থেকে 'মাইলম', সব কিছু এখানে একাকার। মাঠার উপর ভাসমান মাখন।
তারই মধ্যে আবার গেলাশের সাথে গেলাশের কারসাজিতে অপূর্ব ফেনা তুলে ঘোষ বেটা
আমাকে এমন আকৃষ্ট করলো যে এক গ্লাস এখনই চাই। তাকিয়ে আছি আমি অসহায় পরাধীন
বালক। হঠাৎ আমাকে ছুঁ মেরে টেনে নিলো আমার মামার হাত_ 'ট্রেন এসে যাচ্ছে।
তোকে খোঁজে পাচ্ছি না।' কড়া ধমক না খেলে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাদের
একটা সম্মিলিত উদ্দেশ্য আছে। আর তা হল নানা বাড়ী যাওয়া।
ঘরের পেছনে প্রবীণ তেঁতুল গাছ। সে গাছে কয়েক ঘর পেতি্ন পরিবারের বাস।
সন্ধ্যা যখন সর্বাঙ্গে বোরখা জড়ায়, পেতি্নরা তখন পুকুর ঘাটে নাচতে যায়।
মানুষের জন্য তখন তাদের বিরক্ত করা বারণ। রেগে গেলে ধরে নিয়ে ঘাড় মটকে
খাবে। তাই আমরা মামার বাড়িতে আগে ভাগেই ঘাটলায় যাই। তারপরও দল বেঁধে যাই।
একা গেলে বুকের ভিতরটা কুলফি বরফের ধামার মত হিমেল হয়ে যায়।
এমতাবস্থায় তিন বার বুকে থুতু দেবার নিয়ম। মা যান খরম পায়ে। এজন্য নয় যে
শহরের সেন্ডেল গাঁয়ের ধুলিতে অচল। বরং মা আমার বহুদিন পরে নিজের
ঘর-দোর-পাখাল-ঢেঁকী-গোলা, চড়ুই ভাতির সাথী, এক্কা দোক্কার উঠান, বাঁশঝাড়ের
তলায় পুতুল খেলার গলি সব পেয়েছেন বলে শৈশবের অভ্যাসগুলোর পরিপূর্ণ উপভোগ
করে মজা পেতে চান।
আমার পক্ষ থেকেও খরম পায়ে সখ করে মায়ের অনুকরণে হাঁটার চেষ্টা হয়েছে।
আঙ্গুলের চিপায় ভীষণ ব্যথা হয়। মা আজও তাতেই অভ্যস্ত। বড় নানার খড়ম সবচে
বড়। তার পা কম বেশী ছোটদের এক হাত। সেই খড়মের বয়স কত? পাঁচ আঙ্গুলের পাঁচটি
ছোট কবুতরের ডিম আর গোড়ালীতে একটি হাঁসের ডিমের ছাপ দেখে অনুমান করা যায়।
হাত মুখ ধুয়ে রশি ঘরে চলে আসি। মাটির ঘরের দেয়ালে মেহবার আকৃতির কুপির
অাঁধার। কুপির শিখা ব্যালে নর্তকীর মত এমন করে নাচেন যেন, দ্রুত তালের শেষ
কসরত শেষে এখুনি কুর্নিশ দিবেন তিনি আর আমরা হাততালি দিব। এ নৃত্যে কোন
বেরসিক পিয়ানোর বাদনটুকু মিউট করে রেখেছেন কেন? এই দুঃখ কি দিয়ে ঢাকি। সেই
নাচনে মত্ত হয়ে আমাদের ছায়ারাও ঘরের দেয়ালে বেসুমার হয়ে কাঁপে যেন পুকুরের
শান্ত জলে হঠাৎ দেওলিয়া বাতাসের কারসাজি। দরজা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকানো
বারণ। নিজের ভেতরের ভয় নিজের ভিতরে গোপন রাখার বাহাদুরী বজায় রাখা বড়ই
দুঃসাধ্য।
এ যেন পুরনো ব্যথার মত ক্ষণে ক্ষণে উসকে উঠে কান্না ধরাতে চায়। যেই দিকে
তাকাই সেদিকেই চোখের পেনসিল দিয়ে দ্রুত আকাঁ হয়ে যায় দাঁড়ানো অথবা বসা
অবস্থায় নানান ভূতের অবয়ব। দিব্যি দেখতে পাই। তারা কু-মতলববাজ সব। মায়ের
হাত ধরে তাই বাইরে প্রস্রাব করতে যাই। প্রস্রাব করার সময়ও ধরে রাখি তার
হাত।
মা হলেন সর্বশংকা, সর্বভয়নাশী, একমাত্র ধনত্তরি আশ্রয়।
দ্রুত ভাত খাবার পাট সাবাড় করে রশি ঘর থেকে বইঠক ঘরে চলে যেতে হবে। সেখানে
খড়ের বেডিং খুলে খেতার উপর তেল চিটচিটে বালিশে শুয়ে থাকবে পাঁচ জন মুনী।
তাদের বাড়ী ভিনদেশে। তারা এক একজন সোয়া সের চালের ভাত খায়। গায়ে মাংসের
ভাঁজ পুরানো বৃক্ষের শিকড়ের মত পেঁচানো। তারা বিড়ি ভাগ করে খায়। তাদের
একজনের কোমরের কাইতনে লম্বা সুতায় বাঁধা রূপা রঙের ম্যাচলাইট। মাঝে মধ্যে
পাথর বদলাতে না পারলে সাত আট ঘষায় একবার আগুন জ্বলে। তাতে কি, ম্যাচলাইট
বলে কথা। কি এক বাহাদুরী যন্ত্র। যার কাছে এ ম্যাচলাইট, তার কদরই অন্য সবার
চেয়ে অনেক উপরে।
গনু মামা পুঁথি পড়বেন আজ। একটা জলচৌকির উপর একটা হ্যাজাক লাইট। ভাড়া করে
আনা। কিছুক্ষণ পর পর পাম দিয়ে মেনটেলের ডিম আলোকিত করার দায়িত্ব মামার
হাতে। পুঁথির নাম 'নদের চাঁদ'। মায়ের একমাত্র পুত্রধন কুমির হবার বিদ্যা
শিখেছে। দুইটি মাটির কলসে দুইটি মন্ত্র পড়ে পানি ভর্তি করে রাখা আছে। সবার
অনুরোধ উপেক্ষা করার শেষে সকলে গিয়ে মাকে ধরেছে- মা গো তোমার পুত্রকে বলনা
সে যেন একবার কুমির হয়ে আমাদের দেখায়। সবার অনুরোধের ঢেঁকি গিলেছেন মা।
মায়ের অনুরোধ- 'পুতরে সবাই যখন কয়, শেষ বারের মতন কুমির হইয়া দেখানোরে
বাপ।' পুত্র বলে_ 'মাগো- এক কলসের পানি যদি ঢাল দেহে, আমি তবে কুমির হব।
তবে সাবধান, দ্বিতীয় কলসের পানি, যে পানিতে মানুষ হবার মন্ত্র ফঁকেছি মাগো,
সেটা কিন্তু রেখো সাবধানে। সে পানি দেহে না ছড়ালে আমি কিন্তু কুমির হয়েই
রব।' মা বলে_ 'আচ্ছা বাপ। আমিই ঢালবো তোর দেহে সেই পানি। তুই কুমির হইয়া
যা।'
যথারীতি প্রথম কলসের পানি দেহে ঢালতেই মায়ের পুত্রধন কুমির হয়ে উঠানে লেজ
নাড়তে থাকে। কিন্তু হায়! লেজের আঘাতে দ্বিতীয় কলসের পানি পড়ে যায়। লেজের
দিকটা কিছুটা মানুষের রূপ পায়। কিন্তু ছেলে আর মানুষ হয় না কভু। অবশেষে
মায়ের ছেলে 'নদের চাঁদ' কুমির হয়ে নদীতে চলে যায়। মা যায় পিছু পিছু। সেই
থেকে মা থাকেন নদীর কূলে। নদের চাঁদকে ডেকে আনেন কিনারায়। আর কাঁদেন অঝোরে।
এই পুঁথির সকরুণ বিবরণ রাত দুটার নীরব পল্লীর বৈঠক ঘরের সামনের উঠানে সমবেত
শ্রোতামন্ডলীর প্রত্যেকের মনের গহীনে কুরে কুরে খায়। মা আমার গালে হাত দিয়ে
দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। 'আমি কি নদের চাঁদ?' অবাধ্য আবোল তাবোল ভাবুক ছেলেটি
তার। যাকে বুঝাও যায় না, যে কিছু বুঝেও না, অথচ তার উপর আগামী সংসারের ভার।
পুঁথি পড়া শেষ। মুনীরা ঘুমিয়ে গেছে। হ্যাজাকের আলো ম্লান। তাই বিদায় নিয়েছে
উলোপোকার দল। কেবল দু'একটা ক্লান্ত আহত বৃদ্ধ উলোপোকা ছাড়া। কিন্তু সমবেত
দর্শকদের সবাই বসে আছে। সমবেত বেদনার ভারে, গ্রামের এই ক্ষুদ্র অংশে আজ ভোর
হবে না যেন। দূরে শিয়ালের ডাক। হিজলের ঝোপে জোনাকিরা কবর পাহারারত।
পৃথিবীর সকল মা আজ এখানে একাকার হয়ে একজন মায়ের নদের চাঁদের দুঃখে সমব্যথী
হতে এসেছেন যেন। অথবা যেন আমার মায়ের হাতে আজ এই পুঁথি পড়ার রাতে পৃথিবীর
সকল মায়ের পুত্রহারা শোক একটি তজবীর একশত দানায় এসে গাঁথা হয়ে গেছে। মা সেই
তজবীর দানাগুলি টিপে টিপে ছাড়ছেন। নির্দিষ্ট লয়ে একটি একটি করে দানার উপরে
দানা পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ এখন নেই কি? সব শব্দ স্তব্ধ করে এই শব্দই
আমার কানে এসে এমন ভাবে বিঁধে যাচ্ছে যেন আমি এক বিখ্যাত মাতৃহৃদয় বিশেষজ্ঞ
বালক। আমার বুকের বেদনার গভীরতা আমারই বুকে নীরবে বাধা পড়ে থাকে, কেউ তা
জানে না। সবাই যখন ঘুমায় আমি তখন নদের চাঁদের কথা ভাবি। হায় নিষ্ঠুর
বিধাতা। এক কলসী পড়া পানি ফেলে দিয়ে কি করুণ ব্যাঞ্জনায় এই পৃথিবীকে
দীর্ঘশ্বাসে ভরে দিলে তুমি। নদের চাঁদ কি কখনো মানুষ হবে না? না হোক। নদের
চাঁদ কি তার মা কে চিনে? মায়ের ব্যথা বুঝে? নদের চাঁদের কুমিরের চোখে মা কি
তাকিয়ে তার পুত্রকে খোজে পায়? যেন পায়, আমার এই কামনায় রাত গভীর থেকে
গভীরতর হয়। এমন সময় একটি ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠে। এটা কি মাল গাড়ী না
যাত্রী গাড়ী? সে যাই হোক রাত অনেক হয়েছে, আমাকে ঘুমাতে হবে। এখন আমার ভয়
ধরে যাচ্ছে। পাশে যদিও মামা আর মামাতো ভাই। তারা গভীর ঘুমে নাক ডাকছে।
তেতুল গাছের পেত্নি পরিবার গুলি এখন নিশ্চয়ই নাচন ধরেছে। রাতই তাদের দিন ।
গায়ে কাঁটা দিয়ে গেল। মনে বড় ব্যথা, বুকে বড় ভয়। সব মিলিয়ে এক অপরূপ করুণ
অতিপ্রিয় অনুভূতির সাগরে ভাসতে ভাসতে একসময় ঘুম এসে গেল।
আজকের দিনটা বড়ই আনন্দের। সকাল থেকে মায়ের খুশি খুশি ভাব। আজ দুপুরে বড়ই
ভর্তা বানানো হবে, মহা ধুমধাম করে বিকালে উত্তর পাড়ায় সবাই মিলে যাবো
বেড়াতে।
সোনালী বর্ণে নিজেকে রাঙিয়ে যথাসময়ে দুপুর এসে গেলো। মধ্য গগন থেকে সূর্য
দু'হাত মেলে রোদ বিলাচ্ছে। মেঘহীন দীঘি-জল বর্ণের আকাশে কয়েকটা চিলের ধীর
উড়াল। এই মাত্র একটা ঘুঘুর ভাব-গম্ভীর ডাকে নীরবতা ভঙ্গ হল। যদিও অনেকক্ষণ
ধরে খালের ওপারের পড়শী-গাঁয়ের পাকঘর থেকে স্বরবৃত্ত ছন্দে ঢেঁকির শব্দ
আসছিল 'কেহুর কত্ কেতুর কত্'। এই শব্দ নিরবতার সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে
গিয়েছিল। যেন এই শব্দ আদি শব্দ- পৃথিবীর হৃৎপন্ডের শব্দ।
তরজার বেড়া দিয়ে আড়াল করা পুকুরের মহিলা ঘাটলায় এলে বেলে শিকড়ের ফাঁকে পাথর
বসিয়ে জলের দেড় ইঞ্চি উপরে কাল কাঠের ঘাটলা। দূর থেকে হঠাৎ দেখলে মনে হয়
কুমির ঝিমাচ্ছে। সেই কাল কাঠের ঘাটায় বসে কাপড়ে বাংলা সাবান ঘষছে
'মেওয়ালালের মা'। মুখে তার অনর্গল কথার ধারা। গোপনে কার বিয়ে হল, কার ঘরে
কার চুরি যাওয়া পেয়ালা পাওয়া গেল, বিড়ালে মুখ দেয়া খাবারে কোন বাড়ীতে
মেহমানদারী হল_ সব তার এক বেন্ডের বাংলা রেডিওর খবর। সবাই মজা করে শুনছে।
এমন মনযোগ যেন মুখস্থ করে ফেলা চাই।
ইতিমধ্যে মা এসেছেন। এসব কথায় তার আকর্ষণ নেই। এমন সময় একটা কিশোর দৌড়ে
এসে বললো- 'রেল লাইনের ধার দিয়া সাদা কাপড় পইরা লম্বা মত কে যেন আসতাছে।
দূরে দেখা যায়। দুলাভাইয়ের মতন মনে হয়।' সমস্ত দিনের জন্য জমা করে রাখা এক
অাঁচল আনন্দ যেন নিমিষেই মায়ের বুকের কোচড় থেকে বড়ই এর মত ঝরে পড়ে গেল। তা
হলে কি মায়ের নাইয়র শেষ হয়ে গেল। শংকা লুকিয়ে রেখে মা তবু গোসল সারেন।
উঠানে এসে কাপড় শুকাতে গিয়ে মা টের পান যেন তার হাতের শক্তি উধাও, পা থেমে
আসতে চায়। কান পেতে মা শুনতে চান, আগন্তুকের সর্বশেষ খবর। যদি শুনতে পান-
'না দুলাভাই না, অন্য কেউ- এই ভরসায় তজবী গুনেন মা।
দুপুরে আজ ভর্তা করার কথা ছিল। মুছি, বড়ই, ধনেপাতা, শুকনা লংকা, গুড়, সব
কিছু ঢেঁকিতে ফেলে ভর্তা বানানো হবে। জিবে শব্দ করে মজা করে খাওয়া হবে। সব
মাটি হয়ে যাবে কি তবে?
কথা ছিল মা খালারা সবাই মিলে যাবেন নানীর বাপের বাড়ী- মায়ের মামার বাড়ী।
যাবার কথা ঠিকঠাক। সেখানে মায়ের সই অপেক্ষা করে আছেন। মায়ের অনেক স্মৃতি।
সই এর পুতুলের সাথে মায়ের পুতুলের বিয়েতে সত্যি সত্যি পাড়া পড়শি দাওয়াত করা
হয়েছিল। তাহলে কি আর যাওয়া হবে না?
অবশেষে চামড়ার সু্যটকেস হাতে পিতা এসে উঠানে হাজির হলেন। এসেই বললেন খুব
তাড়াতাড়ি তৈরী হতে হবে। বিকালের ট্রেন ধরা চাই-ই চাই। নানা-নানী, মামা,
খালা, পাড়া-পড়শীর আবদারের পালা শুরু হল। প্রত্যেকে একে একে এসে বাবাকে
অনুনয় করছেন- মাকে যেন এ যাত্রায় না নেয়া হয়।
মা বলছেন- না রে চইলা যাওয়াই ভাল, আবার আসা যাবে।
- কতদিন পর আইলা। আবার কখন আইবা। থাইককা যাওনা কয়দিন। দুলাভাই রাজি হইবো।
পিঠা বানাইমু। গুড়ি দুইক্কা রাখলাম। পিঠা খাইয়া যাইবা না।
সেই পুরনো ঘানি। সকাল থেকে রাত। ঘুম থেকে জেগে আরেকটা দিন। বিকাল হলেই
আজানের আগে আগে মুখের হাওয়া দিয়ে পুরনো গেঞ্জির কাপড়ে হারিকেনের চিমনি
মোছা। জিয়ল কই মাছ এ্যালমোনিয়ামের ডেকচিতে মরে ভেসে থাকলে লেবু পাতা দিয়ে
সেই মাছের ভর্তা তৈরী করা। পুরানো শুকনো ডালে বাসি হয়ে যাবার মুখরোচক
গন্ধের মধ্যে সংসারের দরিদ্রতাকে ভুলে যাবার চেষ্টা। আমরা যখন দরিদ্রকে
ভাগাভাগি করি আর মা আমাদের আগলে রাখেন গভীর মমতায়। পড়শীরা ধনী। তাদের
দ্বিতল বাড়ী। সে বাড়ীতে পৃথক রান্না ঘর। সেখানে খানসামা, আয়া, বাবুর্চি।
আমাদের ঘরে মা ই সব। বাবা ভোরে অফিসে যান আর রাত করে ফিরেন। অনেক রাত করে
ফাইলে কাজ করেন। মা কাপড় ধুয়ে ভাঁজ করে রাখেন। আমি বড় ছেলে, মা বলেন- একদিন
আমাদেরও হবে। সততাকে ধনের মত ধরে রাখা বাবার পক্ষে বড় কষ্ট হয়। পরিভ্রমে
দুশ্চিন্তায় ক্লান্ত হয়ে একসময় মা অসুস্থ হবেন। লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেও
তা যখন পারবেন না, তখন তা প্রকাশ পাবে। ততদিনে ক্যান্সার অনেক দূর এগিয়ে
গেছে।
পাস করা ডাক্তারের ঔষধ ব্যর্থ করে মা আটিয়ায় শুয়ে পড়বেন। যিনি সবার সেবা
সুশ্রূষা করেছেন, তার সেবা করার মানুষের বড় অভাব হবে। পাতলা সুপও তার মুখ
দিয়ে সরবে না।
বিছানার পাশে মায়ের পানের বাটা করুণ তাকিয়ে থাকবে। সেখানে অনেক ধুলি। সেই
ট্রাংক। সেখানে মায়ের জর্জেট শাড়ী- অভিমানে পড়ে থাকবে। কয়েকটা গহনা বহু
কষ্টে রক্ষা করেছিলেন তিনি লুকিয়ে। আমার পড়ার খরচ, বোনের বিয়ের জন্য।
সেগুলো হস্তান্তর ও পিতার উদ্দেশ্যে কিছু বলে যাবার ইচ্ছা থাকে তার। সংকোচে
বলা হবে না। যা যা করা হয়নি। সব করবেন এবার। দিন গড়িয়ে যাবে। মায়ের বড়
ইচ্ছে হবে নাইয়র যাবার জন্য। মামা আসবেন। বেডিং বাঁধা হবে। ট্রেনের টিকেট
মিলবে। ষ্টেশনে নেমে দেখবেন নতুন দুপুর। আনন্দে আত্মহারা মা। নিজ গ্রামে
ফিরে আসতে পেরে বড়ই সুখী। এবার আর কারো কথাই শুনবেন না। কোন বাধাই মানবেন
না। বাবা আসলেই ঘরে ফিরবেন না। বাবা যেমন কারো অনুরোধ শুনেননি। এবার মা তার
বদলা নিবেন। তিনি কারো অনুরোধ শুনবেন না।
সেখানে পুকুর পাড়ে ঝুঁকে পড়া বড়ই গাছ। টক বড়ই এর স্বাদ ধনে পাতা শুকনা মরিচ
লবণে মুখ কুচকাবেন। জিবে শব্দ হবে টক স্বাদের শব্দ। নারিকেল তেল মাখবেন
চুলে। কাকই দিয়ে লম্বা চুলে সিঁথি কাটবেন। এত কষ্ট আর সয় না।
সত্যি সত্যি মা'র নাইয়র যাবার সময় এসে গেল। কেবল তার জন্য একটা টিকেট
মিললো। এবার পালকিতে চড়ে যাবেন মা। পালকি যাবে চারজনের ঘাড়ে চড়ে। সেই
পালকিতে বসার বদলে শুয়ে ডেতে হয়। নীল জর্জেটের বদলে পরতে হয় সাদা সর্বাঙ্গ
হেজাব। কাউকে সঙ্গে নিয়ে নয়, একাই যাবেন মা। কিছুদূর এগিয়ে দেবার ছলে আমি
মায়ের নাইয়র যদি হই্_ মা বলেন- ঘরে যা। কথা দে, ঘর ভাঙ্গবি না।
সেই পরিবর্তনের প্রত্যাশায়.......
মশিউর
রহমান রম্নবেল
বর্তমান পৃথিবী এক অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয় নতুন যুগে। এক সময়ের কলের গান,
কাগজের ঘুড়ি আর পায়রার পায়ে বেঁধে দেয়া চিঠির যুগ পেরিয়ে পদার্পণ করেছে
সাইবার যুগে। তথ্য প্রযুক্তির অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার ইন্টারনেট একই সুতোয়
গেঁথে চলেছে এক দেশের সাথে অন্য দেশের, এক মানুষের সাথে অন্য মানুষের
সম্পর্ক। বিশ্বায়নের এই ঘূর্ণিপাকে সব কিছুই পরিবর্তত হচ্ছে। চারপাশের সব
কিছুই দ্রম্নত পাল্টে যাচ্ছে। পরিবর্তনের ছোঁয়া সর্বত্রই। বাদ পড়েনি
গণমাধ্যমেও। ইতোমধ্যে ঢাকার জাতীয় দৈনিকগুলোর আকারেও পরিবর্তন এসেছে। হাজার
বছরের প্রচলিত কাগজ-কালির সংবাদপত্রের জায়গায় বর্তমানে ঠাঁই করে নিচ্ছে
ইলেকট্রনিক কালি বা সাইবার জার্নালিজম। যার নব বা নবীনতম সংযোজন অনলাইন
সংবাদপত্র (যারা প্রিন্টটেড কোন সংস্করণ করে না কোথাও), ইউটিউব এবং অনলাইন
রেডিও যা হাজারো বছরের ধ্যান_ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দিতে শুরম্ন
করেছে। তাই এই মুহূর্তে পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের নিজ নিজ চিনত্দাধারায়ও।
চাই সৃষ্টিশীল উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা এর গুণগত পরিবর্তন। এ ৰেত্রে
পরিবর্তন দেখতে চায় বাংলাদেশের জনগণ। এমনকি প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষীরাও। তবে
কাটছাঁট বা মাইনাস করে গুণগত পরিবর্তন দেখতে চায় না কেউ।
দিন বদলের স্বপ্ন কে না দেখতে চায়। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে উন্নতর পরিবর্তন
চায় সবাই। এমন কোন পরিবর্তন চায় না কেউই যা হিতে বিপরীত হয়। যেমনটা ধরা
যাক, বিশ্বায়নের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন। যার ফলে বর্তমানে
পৃথিবী ধীরে ধীরে মহাবিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যেখানে বৃষ্টির মৌসুমে
বৃষ্টি নেই, কখনো আবার অতিবর্ষণ। শুষ্ক মৌসুমে মারাত্মক খরা ও শস্যহানি,
আবার কখনও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, 'সিডর', 'নার্গিস', 'রেশমী' ও জলোচ্ছ্বাসের মত
পৌন:পুনিকতা। বলতে হয়, উন্নত দেশগুলোর উন্নততর পরিবর্তন অত্যাধুনিক
কলকারখানা আমাদেরকে অধুনিক যুগে প্রবেশ করে দিলেও বাড়িয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিক
উষ্ণায়ন। আর এরই প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋতু বৈচিত্র্যের
ধারা। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। যা বর্তমানে খাতা-বই ও কাগজ-কলমের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ। প্রলম্বিত হচ্ছে গ্রীষ্ম ও বর্ষা। সংকুচিত হচ্ছে শীতকাল। শরৎ ও
হেমনত্দের অসত্দিত্ব বিলুপ্ত প্রায়। একবিংশ শতাব্দীর শুরম্নতেই জলবায়ু
পরিবর্তন পৃথিবীর টেকসই উন্নয়ন ও মানবজাতির অসত্দিত্বের ৰেত্রে বড় হুমকি
হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা বলার অবকাশ নেই। আমরা এমন পরিবর্তন চাই না। যে পরিবর্তন
আমাদের নিজেদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা চাই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে মানসিকতা ও নিজস্ব চিনত্দা-চেতনার
পরিবর্তন। চাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠার
পাশাপাশি সর্বসত্দরে বিশেষ করে রাজনীতি ও নির্বাচনে কালো টাকার
প্রভাবমুক্ত। কিন্তু বিগত দুই বছর ধরে অরাজনৈতিক সরকার চালকের অভূতপূর্ব
পরিবর্তনের প্রতিশ্রম্নতির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাই না। চায় না দেশের
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কেউই। এক এগারোর পরবর্তী সময়ে বহুবার পরিবর্তনের
বহু প্রতিশ্রম্নতি দিলেও দেশের মানুষের তেমন কোন পরিবর্তনই আসেনি। বরং
দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পড়ে নিষ্পেষিত হয়েছে দেশের মানুষ। নিম্নবিত্তদের
কথা নাই বললাম; মধ্যবিত্তদের মধ্যে অসত্দিত্ব সংকটে ভুগছে অনেকেই।
নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সকলকিছুরই মূল্য ঊধর্্বগতিতে। পারিবারিক কলহ বা
দ্বন্দ্ব বেড়েছে বহুগুণে। আমরা এমন কোন পরিবর্তন চাই না। যা দেশের মানুষের
বিরম্নদ্ধে অবস্থান নেবে। দাঁড়াবে জনগণের বিপরীতে। আমরা চাই দেশের মেধা,
সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার সাথে সমন্বয় করে পরিবর্তিত নতুন পথের যাত্রী হতে।
উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও আর্থ- সামাজিক পরিবর্তনের পথে অন্যতম
অনত্দরায়গুলোকে ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে।
আমরা জানি, পরিবর্তন প্রচেষ্টা আর বদলে দেয়ার স্বপ্ন থেকেই ভারতবর্ষ
বিদেশীদের শাসনমুক্ত হয়েছিল। আর ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিসত্দান থেকে পূর্ববঙ্গ
বেরিয়ে এসেছে যা তৎপরবর্তীতে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। আর এই
পরিবর্তনের সার্থক হয় তখনই যখন একই স্বপ্ন থাকে অনেকের মাঝে।
এবার আসা যাক পরিবর্তন চায় না কারা? কারাইবা ভয় পায়? ঢালাওভাবে বলতে গেলে
প্রতিটি সমাজের মুষ্টিমেয় বিত্তবান ব্যক্তিরা পরিবর্তনকে ব্যাপক ভয় পায়।
কারণ, পরিবর্তন যদি তাদের বর্তমান অবস্থার অবনতি ঘটায়। তবে সমাজের বড় অংশই
পরিবর্তন চায় যদি পরিবর্তন তাদের ভাগ্যোন্নয়নের পথেয় হয়।
প্রসঙ্গ: নিউইয়র্ক অফিস
নিউইয়র্ক অফিসই এখন সময়-এর প্রধান কার্যলয় যেখানে বসেন সম্পাদক কাজী শামসুল
হক। যার তীক্ষ্ন বুদ্ধি আর মেধার সমন্বয়েই এখন সময় পরিবর্তন প্রচেষ্টা নবম
বছরে পদার্পণ করলো। সংবাদ প্রকাশে আবারিত স্বাধীনতা, যুক্তি, পরামর্শ যা যে
কোন রিপোর্টারের জন্যই শিৰণীয়। আর সম্পাদকের নির্দেশনায় চলে ঢাকা অফিস।
যদিও ঢাকায় বসে স্থিরচিত্রে নিউইয়র্ক অফিস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা অর্জন
করতে সৰম হয়েছি। আর এখন সময়-এর অষ্টম বছরের পদার্পণ সংখ্যায় নিউইয়র্ক
অফিসের ফারহানা চৌধুরী'র 'এখন সময়-এ আমার সময়' প্রকাশিত লেখা থেকে যতদূর
জানতে পেরেছি তিনি সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন অনেককেই, তবে তাদের মধ্যে
অনেকেই বর্তমানে নেই। তবে যারা আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সাংবাদিক সাইদ
তারেক ও ফকীর সেলিমসহ যারা আছেন তাদের নিরলস প্রচেষ্টা ও মেধা দিয়ে যে
পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তা ঢাকা অফিসেই বসে অনুধাবনযোগ্য।
ফারহানা চৌধুরীর ঐ লেখা থেকে যা বুঝেছি নিহার সিদ্দিকী একজন ফটো
জার্নালিস্ট হলেও আবেগের দিক থেকে তিনি পত্রিকার সর্বময় বিরাজ করে থাকেন।
ঢাকা অফিসের হাঁড়ির খবর
পরিবর্তন প্রচেষ্টার অঙ্গীকার নিয়ে নবম বছরে পদার্পণ করল নতুন শতাব্দীর
সাপ্তাহিক 'এখন সময়'। আটটি বছর পেরিয়ে যখন নবম বছরে পা রাখতে যাবে এখন সময়
ঠিক তার কিছুদিন আগেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে ঢাকা অফিসে। পরিবর্তন আসে অফিস
ডেকোরেশনে, প্রস্তুতি চলতে থাকে পরিবর্তনে। ঢাকা অফিসের পৰ থেকে কোন পাতায়
কি যাবে। 'পরিবর্তন প্রচেষ্টার ৯ বছর' এর লোগো কেমন হবে। কার কার লেখা
যাবে। কে কে লেখা দিয়েছে। কারা দিবে। এ নিয়ে অনেকটা ব্যসত্দ সময় কাটিয়েছেন
বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজী জিয়া শাম্স। ঢাকার চিঠি নামে তার নিয়মিত কলামে
এবার প্রবাসীদের কি উপহার দেবেন তা নিয়েও চলে আলোচনা।
নিত্য নতুন চিনত্দাচেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে স্বাদ আর সাধ্যের সমন্বয়ে অবিরল
ঢাকা অফিসের কর্মী বাহিনীকে নিরলসভাবে পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা যুগিয়ে
যাচ্ছেন আহমদ হোসেন মানিক। যার তুলনা তিনি নিজেই।
এখন সময়-এর নিয়মিত কলামিস্ট রইস উদ্দিন আরিফও বর্ষপূর্তির বিশেষ সংখ্যার
লেখা নিয়ে বেশ ব্যসত্দ সময় কাটিয়েছেন 'একুশ শতকের রাজনীতি : প্রেৰিত
বাংলাদেশ' লেখাটি নিয়ে। যা অষ্টম বর্ষপূর্তি সংখ্যায় প্রকাশিত হল।
অনেকটা নীরবে-নিভৃতে একটানা 'পরিবর্তন প্রচেষ্টার ৯ বছর'-এর লোগো তৈরি ও
প্রথম পাতার শৈল্পিক কি কি ছোঁয়া দেয়া যেতে পারে তা নিয়ে বেশ কয়েকদিন
ব্যসত্দ সময় কাটিয়েছেন ঢাকা প্রতিনিধি কাজী রাফি শামস।
আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার আর নান্দনিকতার ছোঁয়া কিভাবে আনা যায় তার
জন্য প্রথম থেকেই নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গেছেন রাহাত শামস। যার শৈল্পিক
নৈপুণ্যতা আর কর্মশৈলী ফুটিয়ে তুলেছে আজকের এই 'এখন সময়' পাতায় পাতায়।
পাশাপাশি গ্রাফিক্স ডিজাইনার খ. এনামুল হকের তো জুড়ি নেই।
এছাড়াও ঢাকা অফিসের নিয়মিত দৰ কর্মী বাহিনীর মধ্যে হানিফ রাজা, ম.ই টুটুল,
জবাদুল আখতার, আব্দুছ ছামাদ খান ভাইয়ের নামও উঠে আসে।
এখন সময়-এর আজকের শুভৰণে প্রবাসী বাংলাদেশী, যারা নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিয়ে
সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন। যারা নিয়মিত পড়েন তাদেরই অহঙ্কার আজকের এই
'এখন সময়'। যে পরিবারের সাথে আমিও যুক্ত।
সর্বশেষে-এটাই বলব যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
মার্কিন অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছেন। আর এই
পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকুক। অনত্দত একটু ছোঁয়া লাগুক বাংলাদেশে। যাতে
করে গণতন্ত্রের দ্বার উন্মোচিত হয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে
বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ। সেই পরিবর্তনের
প্রত্যাশায়......
_মশিউর রহমান রম্নবেল
জীবনের রোডম্যাপ ও "এখন সময়"
খন্দকার এনামুল হক
পড়াশোনা শেষ করতে না করতেই মনে হলো পরিবারের আর্থিক যে সমস্যা তাতে এখনই
কিছু করা দরকার। বাবার উপর অনেক চাপ পড়ে যাচ্ছে। যেই কথা সেই কাজ। পড়াশোনার
যে অবস্থা তাতে করে ভালো কোন চাকুরী জুটবে না নিশ্চিত ছিলাম। তারপরও
কারিগরী দিক বলতে কম্পিউটাররের সম্যক ধারণা ছিলো। যথারীতি ঢাকায় এলাম সোনার
হরিণের খোঁজে। বাবার পরিচিত কয়েকজনের কাছেই গেলাম কিন্তু সোনার হরিণের দেখা
পেলাম না। তারা বললো কম্পিউটারের গ্রাফিক্স জানলে কোন সুযোগ সুবিধা হতে
পারতো। কি আর করা কোথায় গ্রাফিক্স শিখবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। বাবা নিয়ে
গেলেন একটি অফিসে যার সামনে ছোট একটি বিলবোর্ড এবং বিলবোর্ডের গায়ে লেখা
'এখন সময় নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা- ঢাকা বু্যরো অফিস'। অফিসটা
খুবই সুন্দর বিশেষ করে এর ইন্টোরিয়র ডিজাইন আমার খুবই পছন্দ হয়েছিলো কাঠের
দরজা ঢুকতেই চোখে পড়ে ভাঙা একটি ওয়াল এবং ওয়ালের উপর দারুন একটি বনসাই।
একেকটি ওয়াল একেক রং এর। কথা হলো ঢাকা বুর্যো চিফ কাজী জিয়া শামস এবং তার
ছোট ভাই কাজী রাফি শামসের সঙ্গে এবং মোটামোটি একটা ব্যবস্থাও হলো যে আমি
এখান থেকে গ্রাফিক্স শিখবো এবং যেহেতু কম্পিউটার জানি সেহেতু তাদের কাজে
কিছুটা সাহায্য করবো। রীতিমতো মার আদরের বাধন কেটে তল্পিতল্পা সহ ঢাকার
উদ্দেশ্য রওনা হই। শুরু হয় নতুন জীবন। তবে পত্রিকার ভাইয়াগুলো খুবই সাহায্য
মনোভাবাপনড়ব ছিলো। তবে দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ভাইয়াকে (কাজী রাফি শামস)
পাওয়াই যেতো না। কারণ সে কাজ করতো রাত শুরু হলে। তার ধারণা গ্রাফিক্স খুবই
ঠান্ডা মাথার কাজ সবাই হই হুলোর করলে ভালো কাজের আশা করা যায় না। আমিও
যথারীতি সন্ধ্য। হলেই চা বিস্কিট খেয়ে একটি প্যাড নিয়ে তার পাশে বসতাম সে
কাজ করতো এবং আমাকে বুঝাতো আমি অন্য আরেকটি কম্পিউটারে চর্চা করতাম। এভাবেই
চলতে থাকলো। আর বড় ভাইয়া দিনের বেলায় আমাকে বুঝাতো। দুই ডিজাইনারের
সংস্পর্শে এসে ভালোই জ্ঞান আহরণ করলাম। তবে আমি বলতে পারি যারা বিভিনড়ব
প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স শিখছে তারা শুধু পুথিগত দিকটাই শিখছে- বাস্তব
ধারণাটা অর্জন করতে পারছে না। আমার বেলায় কিন্তু তা হয়নি। আমি শেখার
পাশাপাশি কাজেও লাগাতে পেরেছি। বেশ কিছুদিন কাটলো একদিন পত্রিকার বড় ভাইয়া
(কাজী জিয়া শামস) আমাকে ডেকে বেশ কিছু উপদেশ দিলেন যা আজও আমি ভুলতে পারিনি
এবং কখনো ভুলতেও পারবো না। তবে যখন বলেছেন তখন হয়তোবা তেমন মজা পাচ্ছিলাম
না। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পর একে একে তার কথাগুলো অনুধাবন করতে পারলাম
এবং তার কথাগুলো অনুযায়ী সামনের দিকে ধাবিত হলাম। মোট কথা সে আমাকে একটি
রোডম্যাপ দিয়েছিলো। যা আমার জীবন চলার পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করলো।
মজার একটি ব্যাপার হচ্ছে এরই মধ্যে আমি আরো একজন ভালো টিচার পেয়ে যাই।
(কাজী রাহাত শামস) কাজী জিয়া শামসের কনিষ্ট ভাই। আমার শিক্ষকের সংখ্যা
দাড়ালো মোট তিনজন। যদি কাজী রাহাত শামস অল্প কিছুদিনের জন্য এসেছিলো তারপরও
তার কিছু লেসন আমার খুবই কাজে আসে। কারণ তার সাথে অনেকটা ফ্রি হতে
পেরেছিলাম।
বেশ কিছুদিন পর পত্রিকার বু্যরো চিফ কাজী জিয়া শামস আমাকে ডেকে আমার হাতে
বেশ কিছু টাকা দিলেন এবং বললেন তুমি তো এখন মোটামুটি কাজ পারো এখন থেকে
তুমি প্রতিমাসে আমার কাছ থেকে কিছু টাকা পাবে যতদিন না পর্যন্ত তুমি কোন
ভালো চাকুরী পাও। তবে তুমি চেষ্টা করো ভালো কোন চাকুরী খুঁজতে কারণ আমাদের
এখানে কাজের পরিধি সীমিত যা কাজ তা আমরা দুইভাই মিলেই করে ফেলতে পারি।
হঠাৎ একদিন পেপারে একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম একটি পাক্ষিক পত্রিকায় গ্রাফিক্স
ডিজাইনার নিয়োগ দেয়া হবে। আর দেরি করলাম না সব কাগজপত্র প্রস্তুত করে সেই
পত্রিকা অফিসে দিয়ে আসলাম এবং আমার চাকুরীও হয়ে গেলো চার হাজার টাকা বেতনে।
আমার দিন ঘুরে গেলো। আমি মহাখুশী। সবার আগে আমি যার সাথে দেখা করতে গেলাম
সে হলো আমার তিন শিক্ষকের একজন কাজী জিয়া শামস। তার কাছ থেকে দোয়া নিলাম।
তবে আমার চোখ দিয়ে পানি বেয়ে পড়ছিলো কারণ এই অফিসের দেয়ালগুলোও আমার কাছে
এক একটি সহকর্মী মনে হতো। দেয়ালগুলিও আমাকে বিদায় জানালো। আরো বিদায় জানালো
তার বনসাই ক্যাকটাস এবং আমার চর্চার সেই সবুজ ম্যাক কম্পিউটারটিও। খুব কষ্ট
হচ্ছিলো তারপরও বের হয়ে আসতো হলো।
নতুন পত্রিকা কাজ ভালোই চলছে আমার কাজের গতি এবং শৈল্পিকতার কারণে কিছুদিন
পরই আমার প্রমোশন হয় আমি সেই পত্রিকার গ্রাফিক্স ইন চার্জ হয়ে যাই সাথে
বেতনও বৃদ্ধি পায়। বেশকিছুদিন কাটলো এই পত্রিকারও অনেক অভিজ্ঞতা আছে থাক তা
আর লিখে বড় করতে চাই না। আমার বাবা একদিন একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে
আমাকে বলে তুই এখানে চেষ্টা কর এটা আরো ভালো চাকুরী। যদিও আমার ইচ্ছে ছিলো
না তারপরও বাবার কথা রাখতে বায়োডাটা এবং এপিকেশন জমা দেই যথারীতি আমার
ইন্টারভিউ কার্ড আসে ইন্টাভিউ দেই এবং চাকুরী হয়ে যায় বেশ ভালো বেতনে। এটি
একটি এনজিও আমি সেই এনজিওর কম্পিউটার ইন্সট্রাক্টর।
নতুন চাকুরী শুরু করার আগেই আবারো সেই ভাইয়ার কাছে যাই দোয়া চাইতে। এছাড়াও
আমি প্রায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। যখনই কোন সমস্যায় পরতাম তখনই ছুটে যেতাম
ভাইয়ার কাছে। চলতে থাকলো এনজিও চাকুরী। এরি মধ্যে বিয়ে সেরে ফেলাম। এক
কন্যা সন্তানের বাবাও হলাম। মনে করলাম এনজিও চাকুরীর পাশাপাশি যদি আরো কোন
পার্টটাইম জবের সুযোগ পেতাম তাহলে আর্থিকদিন ভালো যেতো।
হঠাৎ একদিন আমার স্ত্রীর এক কলিগ এর বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম এবং সেই
কলিগের ফ্লাটের ১৭ তলায় আমার সেই প্রথম অফিস। এখন সময় তবে পরিবেশ অনেক
পরিবর্তন হয়ে গেছে। যখন কোন ভুল করে ফেলি তখন মনে মনে ভয় হতে শুরু করে
কিন্তু রাহাত ভাইয়া তা ধমকের দৃষ্টিতে না বলে সুন্দর মতো বুঝিয়ে বলেন। এতে
মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে যে ভাইয়াটা কত ভালো করে বুঝিয়ে দিচ্ছে
আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। তার আরেকটি ভালো গুন হচ্ছে যে কর্মীদের
অসুবিধে এবং কষ্ট বুঝতে পারেন ও বোঝার জন্য চেষ্টা করেন।
আর কথা না বাড়িয়ে এখানেই সমাপ্ত করতে চাচ্ছি। এখন সময় নবম বছরে পা দিচ্ছে।
এগিয়ে যাক আমাদের সময়- এখন সময় আমরাও যেন সময়ের সাথে এগিয়ে থেকে
পত্রিকাটিকে পাঠকের চাহিদা মাফিক যোগান দিতে সক্ষম হই-ভুল ভ্রান্তি হীন
একটি এখন সময় পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারি এই কামনাই রইলো।
আমাদের সংস্কৃতিতে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব
মাহফুজা রহমান হিমি
৯০' দশকের শেষের দিকে বৈপস্নবিক পরিবর্তন ঘটে আমাদের গণমাধ্যমে যা 'ক্যাবল
নেটওয়ার্ক' নামে আবিভর্ূত হয়। হাঁটি হাঁটি পা পা করে যা আজ শহর থেকে
গ্রামেও শোভা পাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন শহুরে মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের
সন্ধ্যা হলে পড়াতে বসতেন আর গ্রামের গৃহবধূরা সাঁঝের বেলায় সাংসারিক কাজ
শেষ করে হাতের তৈরি রকমারী পণ্য বানাতে বসতেন বা গল্প করে সময় পার করতেন
কিন্তু আজ তাদের বিনোদিত করতে ডিস ক্যাবলের বিকল্প বোধ হয় খুঁজে পাওয়া
দুষ্কর।
এতে দেশীয় সব অনুষ্ঠানের মধ্যে সবার মন যুগিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ করার
চেষ্টা করা হয়। যাতে ছেলে বুড়ো, বউ শাশুড়ি বা-বাবা মাকে সাথে ছোট্ট সোনাটিও
উপভোগ করতে পারে তাদের পছন্দের অনুষ্ঠান। সবাই একসাথে বসে ড্রইংরম্নমে টিভি
সেটের সামনে। এখনকার সময়ে আমাদের দেশে ডেইলি সেপ-খ্যাত সিরিয়ালগুলো জায়গা
করে নিয়েছে দর্শকদের হৃদয়ে। এতে রয়েছে কাহিনীর গভীরতা, দর্শন, জীবনবোধ,
রসবোধ, শিৰামূলক সবই এর বিষয়বস্তু হতে পারে। যা মানুষের অনুভূতিগুলোকে
নাড়িয়ে দেয় তাদের শৈল্পিক গুণে। কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি পাশ্চাত্য বা পাশের
দেশ ভারতের অনুষ্ঠানগুলোও দখল করে নিচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে ডেইলি সেপ
খ্যাত সিরিয়ালগুলো অন্যতম। হোক সেটা বাংলা বা হিন্দি। বিঘ্ন ঘটছে তখনই যখন
পরিবারের সবাই ড্রইংরম্নমে টিভি সেটের দর্শক হয়ে একসাথে বসে দেখছে। এর মূল
আকর্ষণ থাকে অগভীর কাহিনী, বাহারী পোশাক, কড়া মেকআপ, উগ্রজীবনবোধ, অশালীন
সংলাপ, অশালীন দৃশ্যায়ন ও অশালীন পোশাক। এগুলো যখন একটি অনুষ্ঠানের উপজীব্য
হয় তখন দর্শকবৃন্দের বিব্রত অবস্থায় পরাটা অস্বাভাবিক কিছু না। কখনও কখনও
বোঝা যায় না কোনটা মা কোনটা মেয়ে। কোনটা বাবা কোনটা ছেলে। আবার এটাও দেখা
যায় বাবা-মা, দাদা-নাীরাও দাদু নানুরাও কম যান না। সাধারণত বয়সী চরিত্রদের
চুলে মুখে বা পোশাকে পরিবর্তন দেখেই আমরা অভ্যসত্দ ফলে তাদের সদ্য তারণ্যে
পরা ছেলেমেয়েদের মত পর্দায় উপস্থিত হয়ে দেখতে হয়। এসব আর্টিস্টরা নিজেদেরকে
আকর্ষণীয় করতে শারীরিক আকর্ষণকে পুঁজি করেন। ফলে তাদের সাথে যারা জুনিয়র
আছেন তাদের চেয়ে খুকি খুকি ভাব আনতেও তারা পিছপা হন না। আসল কথা তারা
অশালীন সংলাপ বা দৃশ্যায়ন অলংকারের প্রদর্শনী বা পোশাকের প্রদর্শনী,
উগ্রসংস্কৃতিই তারা ফ্যাশন কালসার মনে করে। আজকাল তো আমাদের দেশে তাদের
প্রোগ্রাম বা ড্রেসের স্টাইল দিয়ে পোশাকের নামকরণ করা হয়। তাদের সাজপোশাকে
এসব অশালীন ভাব দেখে মনে 'যাত্রাপালা' দেখছি। কাহিনীর মধ্যে নেই কোন
গভীরতা। একমাত্র বিষয় 'প্রেম' ও প্রতিহিংসা, 'নায়িকা' প্রধান এসব ডেইলি
সেপ-এ নায়িকাদের স্রষ্টার পদে আসীন করে। খুব জটিল বা খুব সাধারণ যে কোন
বিষয়ই তার সাহায্য ছাড়া। পরিত্রাণ পাওয়া যায় না। বিয়ে নামক সামাজিক ও
ধর্মীয় এ পবিত্র বন্ধনকে যে রূপ দিয়েছে তাতে মনে হয় বহুবিবাহ করাটা সামাজিক
রীতি। একজনের একাধিক স্বামী বা স্ত্রী থাকতে পারে। অনৈতিক সম্পর্কে
জড়ানোটাও তাদের কাছে ছেলেখেলা এবং 'জারজ' সনত্দানকেও তারা ঐরমযষরমযঃ - করে
গল্পে ঞরিংঃ আনার জন্য। আরও রয়েছে বিজ্ঞাপন বিরতি যার দৈর্ঘ্য সেই
ঊঢ়রংড়ফব-এর সমান। এসব বিজ্ঞাপনের মধ্যে কিছু বিজ্ঞাপন আছে যা অশালীন
দৃশ্যায়নে ভরপুর।
এসব চটুলদার বিজ্ঞাপন বা অনুষ্ঠান দেখে ভাবতে অবাক লাগে যে, এ দেশের শিল্প
সাংস্কৃতির সাথে আমাদের শিল্প সংস্কৃতিকেও একই দেশের নাম দেয়া হতো, একসময়
তাদের গভীর জীবনবোধ থেকে তৈরি সিনেমা 'অস্কার' জয় করেছে। তাদের মেধাকে
সসত্দা জনপ্রিয়তার নামে কেন যে ব্যয় করছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাদের
সৃষ্টিশীলতা কি ওখানেই থেমে গেছে।
আজকাল আমাদের দেশের নির্মাতাদের এর প্রভাব পড়েছে। আমাদের দেশের নাটক বা
সিনেমাতেও তাদের ঈঁষঃঁৎব দেখা যাচ্ছে। যার একটি উদাহরণ 'আহা' ছবিটি। এতে যে
দৃশ্যায়ন বা সংলাপ দেয়া হয়েছে তাতে ভাবতে অবাক লাগে আমাদের দেশের বরেণ্য
এসব শিল্পী বা কলাকুশলীরা কিভাবে এসব অশালীন দৃশ্য বা সংলাপ আওড়ালেন। যখন
চলচ্চিত্র শিল্পে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে সবাই এগিয়ে আসছেন যাতে
পারিবারিকভাবে সবাই একসাথে বসে কোন অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারে, সেই সময় আমরা
দেখলাম এমন একটা ছবি! আমাদের নাটকেও এর প্রভাব পড়েছে যা গুলশান এভিনিউ নামক
একটি সিরিয়ালে দেখা যাচ্ছে। আমরা চাই না ভারতীয় ঈঁষঃঁৎব গ্রহণ করতে। কারণ
এতে সবচেয়ে ৰতিগ্রসত্দ হচ্ছে আমাদের শিশুরা বা কিশোর পার করা 'টিনএজার'রা।
তারা 'পর্ণো' আর 'সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য করতে পারছে
না।' হিন্দি ফিল্ম এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কারণ স্বল্পবসনা
এসব নারীরা তাদের সামনে পর্দায় যেভাবে উপস্থাপন করছে তাতে নৈতিকতাবোধ বা
মানসিক বিকাশ কেমন হবে তা বোদ্ধামাত্রই বুঝেছেন। মানষিক বিকৃতিপূর্ণ এসব
সিরিয়াল বা ছবি দেখে স্বাভাবিক বিকাশই অস্বাভাবিক।
আগামী প্রজন্মকে পথ তৈরি করে দেয়া বা পথ দেখানো অগ্রজ নির্মাণ শিল্পী,
শিল্পী, কলাকুশলীরা বা পৃষ্ঠপোষক যারা আছেন তারা কি ভেবে দেখেছেন পাশের
দেশের কলাকুশলীদেরকে আমরা না হয় বলতে পারব না। কিন্তু আপনাদেরকে বলি আমরা
চাই না। নৈতিক অবৰয়কারীর শিৰা দিতে বা জাতিকে এই অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিতে
বা তাদের মত করে ভাবাতে। কারণ বার হাত শাড়ি পরা আমাদের মায়েদের চেষ্টা থাকে
তাদের অাঁচল দিয়ে ঢেকে অশুভ ছায়া থেকে তাদের সনত্দানদের রৰা করতে। যদি বার
হাত শাড়ি পরা সেই মায়েরা সোচ্চার না হন তবে আমদের হতে ৰতি কি!
আকাশ-সংস্কৃতির সেই নামে অপসংস্কৃতির জয়গান করা কি আমাদের শোভা পায়।
পত্রিকায় স্বাস্থ্য পরামর্শ
ডা. মোঃ আজিজুর রহমান
সিদ্দিকী
সামপ্রতিককালে পত্রিকার সোশ্যাল কমিটমেন্ট বেড়েছে, সব শ্রেণীর, সব রম্নচির
পাঠকদের সেবায় রত পত্রিকাগুলো। ঘরের শিশু, কিশোর, যুবক-যুবতী, ধর্মপ্রাণ
বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ, গিন্নীর সাজগোজ, রান্না-বান্না সব বিষয় নিয়েই একটি
পরিপূর্ণ পারিবারিক কাগজ হতে চাচ্ছে সংবাদপত্র।
এ জন্য স্বাস্থ্য পাতা, স্বাস্থ্যকুশল, স্বাস্থ্যকথা, আপনার স্বাস্থ্য,
আপনার ডাক্তার, মেডিকেল হেলপ, হেলথ টিপস, স্বাস্থ্য কর্ণার, স্বাস্থ্য
পরিচর্যা ইত্যাদি নানা নামে বিভিন্ন পত্রিকায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের
স্বাস্থ্য পরামর্শ, প্রশ্নের জবাব, করণীয়, টিপস, বি দশ দিকনির্দেশনামূলক
লেখা বা বক্তব্য পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। কিছু পাঠক বেশ আগ্রহভরে তা দাঁড়ি,
কমাসহ পড়ে, বিশ্বাস করে, পেপার কাটিং করে সংগ্রহে রাখে, সেই অনুযায়ী জীবন
যাপন করে। এতে অনেক রোগ সম্পর্কে পাঠক জানতে পারে, পারিপাশ্বর্িক
অন্যদেরকেও জানাতে পারে। রোগ প্রতিরোধ বাড়ে, রোগ কমে, মানুষ সুস্থ থাকে।
বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে নানা তথ্য জানে, করণীয় বা কর্তব্য জানে, ঘরের
প্রাথমিক চিকিৎসা, দ্রম্নত করণীয়, সাশ্রয়ী সেবা সম্পর্কে জানে। সঠিক তথ্য
জানে। ব্যক্তিজীবনে বাজার করতে খাদ্য গ্রহণে, চলাফেরা আচার আচরণে ও
প্রাথমিক চিকিৎসায় তা অনুসরণ করে উপকৃত হয়। ডাক্তারি খরচ বাঁচে,
পরীৰা-নিরীৰার ব্যাপারে সাশ্রয়ও সহজ হয়। ডাক্তারের পরিচিতি বাড়ে, তিনি যে
প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পত্রিকায় তারও নাম থাকায় ডাক্তার ও চিকিৎসা
প্রতিষ্ঠান-দুটোই পরিচিত হয়। ডাক্তারগণ চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি লেখনীর
মাধ্যমে জনসেবায় নতুন মাত্রায় অংশ নিতে সৰম হয়। জনগণ এসব স্বাস্থ্য পরামর্শ
পড়ে অন্য ডাক্তারগণ কি কি ভুল ভ্রানত্দি করছেন, কি কি ব্যবসায়িক প্রতারণা
বা বাণিজ্য করছেন-তাও বুঝতে পারেন চেম্বারে ডাক্তারগণ কম কথা বলেন বলে
এগুলো পড়ে বিসত্দারিত জেনে রোগীর বা তার লোকজনের উপকার হয়। তবে, পত্রিকার
স্বাস্থ্য পরামর্শ পড়ে কিছু সমস্যাও হয়।
১। 'অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী' বিধায় পত্রিকার স্বল্প পরিসরে, বানান
বিভ্রানত্দিতে, সম্পাদনার কারণে এবং সর্বোপরি পাঠকের ভুল বুঝার কারণে কখনো
পাঠক পত্রিকার এসব লেখা পড়ে নিজে 'ঘরের ডাক্তারী' করতে গিয়ে সমস্যায়ও পড়েন
কখনো কখনো।
২। বিশেষজ্ঞদের টুকটাক মতবিরোধ একেক পত্রিকায় একেক রকমের হয়-পাঠক এতে
বিভ্রানত্দ হয়।
৩। প্রতিষ্ঠিত বা বড় ডাক্তার যা বলেন তাই সঠিক-এমন কোনো কথা নেই। বিজ্ঞান
দিন দিন নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে আসছে। গতকাল যা করতে নিষেধ করেছিল আজ
তা করতে বলছে। আবার আজ যা করতে বলেছে আগামীকাল হয়তো তার সম্পর্কে নতুন তথ্য
আসবে। তাই কর্মব্যসত্দ বিশেষজ্ঞগণ যারা সর্বাধুনিক চিকিৎসা বার্তা সম্পর্কে
আপটুডেট নন-তার পরামর্শে (তিনি বিখ্যাত ডাক্তার হলেও) কিছু বিভ্রানত্দি
ঘটতে পারে।
৩। অনেক ডাক্তার তার একই লেখা (পুরাতন লেখাগুলো) কুমীরের ছানা প্রদর্শনের
মত নতুন ছবি ও বিন্যাস দিয়ে পুরাতন মদ নতুন বোতলে ঢুকানোর মত বিভিন্ন
পত্রিকায় উপস্থাপন করেন। এটা কখনো ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য, কখনো পত্রিকা
কর্তৃপৰের অনুরোধের প্রেৰিতে করতে বাধ্য হন? তাছাড়া নতুন ভালো লেখার সময় ও
সুযোগ সীমিত কর্মব্যসত্দতার জন্য। তাই ধারাবাহিক ক্রমাগত না লিখে ভালো
লেখার জন্য সময় দিয়ে লিখলে ভালো হয় (ইন্টারনেট ও লেটেস্ট ইনফরমেশন আপডেট
করে)।
৪। ডাক্তারের সাৰাৎকারমূলক লেখাগুলো উপস্থাপক পত্রিকায় ঠিকমত উপস্থাপন বা
বানান বা কনসেপশন ক্লিয়ার 'না' করার কারণে পাঠকের বিভ্রানত্দি হয়।
৫। পত্রিকার (ছাপাখানার ভূতের) কারণে বানান বিভ্রানত্দি, মেডিকেল
টার্মগুলোর সঠিক বঙ্গানুবাদের অভাবেও পাঠকের বিভ্রানত্দি হয়।
৬। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক সময় স্বল্প পরিসরে বেশি সংৰেপ করার কারণে
পাঠকের বুঝতে বিভ্রানত্দি হয়।
৭। স্বাস্থ্য পরামর্শে ওষুধগুলোর জেনেরিক (মূল) নাম থাকে। এ নামে দোকান
থেকে ওষুধ কেনা দুরূহ। ওষুধের পাশর্্বপ্রতিক্রিয়া বলা হয় না, কখন খাওয়া
যাবে না-লেখা থাকে না। এতে সমস্যা হয়।
৮। অনেক লেখায় বলা হয় 'বেশি সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে
চেম্বারে যাবেন'। পাঠক মনে করে এ লেখাগুলো হচ্ছে ডাক্তারের প্রচার ও রোগী
বাড়ানোর অভিনব কৌশল?
৮। রোগীর মত করে না লিখে মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য পরামর্শ
পড়ে সাধারণ পাঠক অনেক সময় তেমন কিছু বুঝেন না। তাই অধিকাংশ পাঠক এ
স্বাস্থ্য বিষয়ক পত্রিকার পাতাটি বিসত্দারিত পড়েন না। মনে করেন বেশি রোগ
হলেতো ডাক্তারের কাছে যাবই-তাহলে আর এগুলো পড়ে লাভ কি? অল্প বুঝে যদি ওষুধ
খেয়ে ঝামেলা বাজে? তার চেয়ে ভালো খেলা পাতা বা রাজনীতির পাতা পড়ি।
৯। ঘুরেফিরে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় বারবার আসায় পাঠক বিরক্ত হয়। প্রায় সব
পত্রিকাই ঐ নির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েই ঘুরে ফিরে বারবার নানা রূপে লিখছে।
পাঠকের যেন এখন তা অনেকটা মুখস্থ। তাই আগের মত আগ্রহভরে পড়ার আকর্ষণ হারিয়ে
ফেলছে।
১০। 'রোগীর প্রশ্ন ডাক্তারের উত্তর'-এইসব বিভাগে রোগীর ও ডাক্তারের নাম
প্রচারেই যেন পত্রিকার প্রচার সংখ্যা বাড়ানোর নতুন অভিনব কৌশল বলে মনে
হয়_কাজের কাজ (চিকিৎসা পরামর্শ) সে প্রশ্ন- উত্তর থেকে তেমন যথার্থভাবে
ফুটে আসে না।
১১। টেলিমেডিসিন অনেক দেশে জনপ্রিয় হলেও আমাদের দেশে তার জনপ্রিয়তা
প্রশ্নবিদ্ধ। তবে প্রেস মেডিসিন (পত্রিকার স্বাস্থ্য পরামর্শ) সে তুলনায়
অনেক বেশি জনপ্রিয়। তার প্রমাণ মিলছে দেশের স্থানীয়, জাতীয়, দৈনিক,
সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরামর্শ বিষয়ক লেখা
ছাপানোর আলামত দেখা যায়। কখনো কখনো শুধু স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিনও দেখা
যায়। এ সবই দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতার ফসল। ভালো কাজের কিছু সমস্যা
থাকতে পারে। তা কাটিয়ে উঠতে সবাইকে আনত্দরিক হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিচার্য
মানুষের সুস্থতা। সে জন্য রোগী, পাঠক, ডাক্তার পত্রিকার লোকজন সবারই
সমন্বিত সঠিক করণীয়টি স্থির করলে উপকৃত হবে মানবতা।
ডা. মো: আজিজুর রহমান সিদ্দিকী
সভাপতি, যুগানত্দর স্বজন সমাবেশ, জাতীয় কমিটি।
সাংগঠনিক সম্পাদক বিএমএ, কুমিলস্না
|
 |